স্বাস্থ্য

বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা প্রথমবারের মতো শিশুদের ছাড়িয়ে গেল

বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা প্রথমবারের মতো শিশুদের ছাড়িয়ে গেল
বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা প্রথমবারের মতো শিশুদের ছাড়িয়ে গেল
নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়েছে, যা জনমিতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

বিশ্বের জনসংখ্যার কাঠামোয় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই জনমিতিক পরিবর্তনকে মানব ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমে যাওয়াই এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

আজ সোমবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্সাস ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার হ্রাস ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমাগত উন্নতির কারণে এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি কয়েক দশক ধরে চলা জনমিতিক প্রবণতার ধারাবাহিক ফল হিসেবেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার, প্রবীণদের যত্ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলোও নতুনভাবে বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্ব জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি দীর্ঘদিনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জন্মহার কমে যাওয়া এবং আরেকটি হলো মানুষের আয়ু বৃদ্ধি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগের তুলনায় মানুষ এখন কম সন্তান নিচ্ছে।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বয়স পিছিয়ে যাওয়া জন্মহার হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সুযোগ ও সচেতনতা বাড়ার কারণে অনেক দেশেই জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই প্রবণতা শুধু উন্নত দেশগুলোতেই নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারাবাহিক অগ্রগতি, উন্নত পুষ্টির সহজলভ্যতা এবং পরিচ্ছন্নতা মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার এবং জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতির ফলেও মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ একদিকে সামগ্রিকভাবে শিশুর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও জাপান প্রথম সারির দেশ, যেখানে জনসংখ্যা হ্রাসের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়তে শুরু করে। রাশিয়ায় জনসংখ্যা কমার প্রবণতা ১৯৯৬ সালে শুরু হয়। অন্যদিকে জাপানে জনসংখ্যা কমতে শুরু করে ২০০৮ সালে।

পরে আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় জনসংখ্যার বার্ধক্যকে প্রধানত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি ধনী দেশের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে এবং এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোতেও দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী।

তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব জনসংখ্যা আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বার্ধক্য জীবনের একটি চ্যালেঞ্জিং পর্যায় হতে পারে, যা নতুন করে ভাবাচ্ছে নীতি নির্ধারকদের।

এর সঙ্গে দারিদ্র্য, একাকীত্ব কিংবা দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যুক্ত হলে প্রবীণদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের আকার ছোট হয়ে আসা এবং সন্তানহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে প্রবীণদের দেখভালের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলোকেও আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক নীতি, আবাসন কর্মসূচি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনসংখ্যার এই রূপান্তর কেবল মানুষের সংখ্যা ও বয়সের হিসাব বদলে দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যৎ সমাজের কাঠামোকেও গভীরভাবে পরিবর্তন করছে। শিশু কম এবং প্রবীণ বেশি — এমন বাস্তবতায় মানুষের জীবনযাপন, পরিবার কাঠামো, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনাও নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন হবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...