স্বাস্থ্যস্বাস্থ্য খাতের ৩ সংস্থায় ৭৩ হাজার পদ শূন্য, জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত
স্বাস্থ্য খাতের ৩ সংস্থায় ৭৩ হাজার পদ শূন্য, জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত
দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনাকারী তিনটি প্রধান সংস্থায় ৭৩ হাজার ৪৫টি পদ খালি রয়েছে, যা মোট পদের ৩১ শতাংশের বেশি। জনবল সংকটের কারণে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনাকারী তিনটি প্রধান সংস্থায় জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মোট ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে অন্তত ৭৩ হাজার ৪৫টি পদ খালি রয়েছে। যা মোট পদের ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এই তিন সংস্থা সরকারি হাসপাতাল পরিচালনা, শিশু ও নারীদের টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। জনবল ঘাটতির কারণে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে গ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই। এর ফলে কম আয়ের অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীর ঘাটতিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দেওয়ার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান সংস্থা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন, দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান তদারকি, চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার দায়িত্ব এই সংস্থার। আগস্ট মাস পর্যন্ত সংস্থাটির ১ লাখ ২৭ হাজার ১০১টি অনুমোদিত পদের ৩৬ শতাংশই খালি ছিল।
প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত পদগুলোর বেশিরভাগই চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসকের। এসব পদের ২৪ শতাংশ খালি রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ২০০ চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসক নিয়োগের পরও এই ঘাটতি রয়ে গেছে।
১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে জনবল সংকট আরও বেশি। এসব পদের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাসহ মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে তারা বড় ভূমিকা রাখেন। এই গ্রেডগুলোর এক-তৃতীয়াংশের বেশি পদ এখনো শূন্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য সহকারী আখিল উদ্দিন জানান, নিয়ম অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্য সহকারীর একটি ওয়ার্ডে কাজ করার কথা। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে অনেককে একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আখিল আরও বলেন, পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, কিন্তু জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যশিক্ষাসহ অনেক সেবা ঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব হয় না।
পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে থাকা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৩৭ শতাংশ পদ শূন্য। এত বড় জনবল ঘাটতির কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শ এবং কমিউনিটিভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ঠিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন সময়ে সংস্থাটি জনবল সংকটে পড়েছে, যখন কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার দেশে মোট প্রজনন হার বেড়েছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের পদগুলোর বেশিরভাগই মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রের চিকিৎসকদের। এসব পদের অর্ধেকেরও বেশি খালি। এছাড়া ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডের ৩৭ শতাংশ পদ শূন্য। এই পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে আছেন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এবং উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কার্যক্রম চালাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ তদারকি করেন। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নারীদের গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা দেন। বাংলাদেশ পরিবার কল্যাণ সহকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌসী আক্তার গত আগস্টের ২৯ তারিখে জানান, পরিবার কল্যাণ সহকারীর ২৩ হাজার ৫০০ পদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি শূন্য। এর ফলে কর্মরতদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
ফেরদৌসী আক্তার আরও বলেন, পরিবার কল্যাণ সহকারীরা মূলত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ করেন, দম্পতিদের স্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করেন এবং গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত গর্ভকালীন সেবা নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়মিত কাজ ব্যাহত করছে। দশম গ্রেডেও শূন্য পদের হার বেশি, চার ভাগের তিন ভাগের বেশি পদ খালি রয়েছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্স ও মিডওয়াইফদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। তিন সংস্থার মধ্যে এখানে শূন্য পদের হার সবচেয়ে কম, ১৩ শতাংশ। সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া নার্সদের ৪৭ হাজার ৫৭৮টি পদের মধ্যে ১০ শতাংশ শূন্য। মিডওয়াইফের ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। মোট ৩ হাজার ৫১৪টি পদের ২৮ শতাংশ খালি বলে সরকারি তথ্যে দেখা গেছে।
প্রয়োজনের তুলনায় দেশে নার্সের সংখ্যা অনেক কম। দেশে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত প্রায় ১ অনুপাত ১। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। এর ফলে কর্মরত নার্সদের ওপর কাজের চাপ অনেক বেশি। যত দ্রুত সম্ভব শূন্য পদ পূরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। গত আগস্টের ২০ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব সিভিল সার্জন এবং সংশ্লিষ্টদের এই বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে।
মতামত (0)