জাতীয়

বিশ্বজুড়ে মানুষ বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে

বিশ্বজুড়ে মানুষ বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে
বিশ্বজুড়ে মানুষ বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে
একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মানুষ 'আমার দেশ সবার আগে' ধরনের চিন্তাধারা ও বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে মত দিচ্ছে।

মানুষ বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘আমার দেশ সবার আগে’—এই ধরনের চিন্তাধারা ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছে বিশ্বজুড়ে মানুষ।

৩৪টি দেশের ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এক জরিপে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি দৃঢ় সমর্থন উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশ জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তাঁরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করেন। এর বিপরীতে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

আজ ইউরোপের মানুষ ষাটের দশকের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পরমাণুবিজ্ঞানীরা তাদের তৈরি পারমাণবিক ‘ডুমসডে ক্লক’ মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, পোল্যান্ড ও জার্মানির মতো দেশগুলো নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি অথবা নিজেদের ভূখণ্ডে অন্য দেশের পারমাণবিক অস্ত্র রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

পৃথিবী ধীরে ধীরে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে গায়ের জোরে চলা ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। সেখানে ন্যায় বা আইন নয়, শক্তিই শেষ কথা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ভানও ছেড়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাইওয়ানের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ ‘কোনো শক্তি বা কোনো ব্যক্তি ঠেকাতে পারবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মুছে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ ওমানেও বোমা হামলার হুমকি দেন।

এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকার, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা ও আইনের শাসনের মতো পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধার অভাবকেই তুলে ধরে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মানুষ ‘আমেরিকা সবার আগে’, ‘রাশিয়া সবার আগে’, ‘চীন সবার আগে’ বা ‘আমার দেশ সবার আগে’—এই চিন্তাধারা ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছে। এসব মতবাদ পৃথিবীকে ‘আমরা’ ও ‘তারা’র অন্তহীন লড়াই হিসেবে দেখে।

প্রতিটি মহাদেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই জাতীয়তাবাদী নেতাদের বিরোধিতা করছে, যারা নিজেদের দেশকে গুটিয়ে রাখতে চায়। এই নেতারা মনে করেন, এক দেশ ভালো করতে হলে অন্য দেশকে খারাপ অবস্থায় যেতে হবে। বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ চায় তাদের সরকার মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষা করুক।

তারা আরও চায়, সরকার জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করুক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে পদক্ষেপ নিক এবং মানবিক সহায়তায় অর্থ বরাদ্দ করুক। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষ এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা চায়। এই ব্যবস্থা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করবে।

এই ব্যবস্থা দারিদ্র্য, রোগ, ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমর্থন কীভাবে বাড়ানো যায়, তা-ও গবেষণায় উঠে এসেছে। যারা নিজেদের সমাজে সক্রিয় এবং জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি সমর্থন জানায়।

জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তারা সহযোগিতার পক্ষে থাকে। তাই সীমান্তের ওপারে সহযোগিতা বাড়াতে হলে আগে নিজের দেশের সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হবে। এখন মানুষকে এক করবে কে—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পৃথিবী এখন একমেরু ব্যবস্থা থেকে বহুমেরু ব্যবস্থায় যাচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ঠিক করত এবং নিজের ইচ্ছা কার্যকর করতে পারত। এখন চীনের উত্থানসহ একাধিক শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, বিশ্বের তিন প্রধান পারমাণবিক শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। বরং মানুষ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের মানুষকে এক করার সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখছে।

এই দেশগুলোর মানুষও সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দিতে বেশি আগ্রহী। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিশালী দেশকে বড় বিষয়ে চাপ দেওয়া কঠিন। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়ে তাদের বিশাল ক্ষমতা রয়েছে। সামরিক হুমকি, শুল্ক, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তারা অন্য দেশকে চাপ দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আবার ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...