জাতীয়

ব্যবসায়ী ওসমান গনি দেউলিয়া ঘোষিত, দায়মুক্তি ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন

ব্যবসায়ী ওসমান গনি দেউলিয়া ঘোষিত, দায়মুক্তি ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
ব্যবসায়ী ওসমান গনি দেউলিয়া ঘোষিত, দায়মুক্তি ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালত ব্যবসায়ী মো. ওসমান গনিকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। এই রায়ের পর তার ঋণ মওকুফ হবে কিনা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মো. ওসমান গনি নামের একজন ব্যবসায়ী ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালত তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের পর তার সব ঋণ মওকুফ হবে কিনা এবং পাওনাদাররা তাদের টাকা ফেরত পাবেন কিনা, এমন প্রশ্ন উঠেছে।

দেউলিয়াবিষয়ক আইন ১৯৯৭ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার দেনা পরিশোধে অক্ষম হলে এবং আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে দেউলিয়া আদালতে আর্জি দাখিল করতে পারেন। আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, দেনাদার 'দেউলিয়া কর্ম' করলে তিনি নিজে বা পাওনাদার আদালতে আর্জি দাখিল করতে পারেন। আদালত সেই আর্জির ভিত্তিতে তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করে আদেশ দিতে পারেন।

দেনাদার নিজে আর্জি করলে ১৩ ধারা অনুযায়ী উল্লেখ করতে হবে যে তিনি দেনা পরিশোধে অক্ষম। তার দেনার পরিমাণ অন্তত ২০ হাজার টাকা হতে হবে। দেনা পরিশোধে অক্ষমতার কারণে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্রি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার বা কারাগারে আটক থাকলেও অথবা তার সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ কার্যকর থাকলেও তিনি আর্জি দাখিল করতে পারেন।

আর্জি দাখিল করলেই দেউলিয়া ঘোষণা হয়ে যায় না। আদালত আর্জি খারিজ না করলে ধারা ৩০ অনুযায়ী দেনাদারকে দেউলিয়া ঘোষণাদেশ দেয়। এই আইনটি মূলত ব্রিটিশ আমলের প্রভিন্সিয়াল ইনসলভেন্সি অ্যাক্ট ১৯২০-এর আদলে গঠিত হয়েছে।

এই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, শুধু ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিই নন, ব্যাংকও দেনাদারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিও নিজে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য মোকদ্দমা দাখিল করতে পারেন। ২০০৩ সালে অর্থঋণ আদালত আইন হওয়ার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বকেয়া ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে।

দেউলিয়াবিষয়ক আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে এবং ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার টাকার বেশি হলে তিনি নিজে আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করতে পারেন। বিকল্পভাবে, ১২ ধারা অনুযায়ী ব্যাংক বা পাওনাদার তাকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন। প্রথমে আদালতে দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।

আবেদনকারী তার সব পাওনাদারকে বিবাদী শ্রেণিভুক্ত করে তার সব ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করেন। তিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম, এটিও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে আবেদনের শুনানিতে আদালত মোকদ্দমা গ্রহণ করলে পাওনাদারদের কাছে আদালত থেকে সমন যায়।

বহুল প্রচলিত দুটি দৈনিক পত্রিকায় পরপর দুই দিন এ-সংক্রান্ত আদেশসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বা বিবাদীরা সমন পেয়ে আদালতে উপস্থিত হন। বিবাদীরা লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং এরপর মামলার সাক্ষী-জেরা ও যুক্তিতর্ক হয়।

সাক্ষী, জেরা ও যুক্তিতর্ক সবকিছু দেখে আদালত যদি মনে করেন যে বাদী দেউলিয়া ঘোষণা করার যোগ্য, সে ক্ষেত্রে তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। অন্যথায় তার দরখাস্ত নামঞ্জুর করে দেওয়া হয়। এই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালত দেউলিয়া ঘোষণা করেন।

দেউলিয়া ঘোষিত হলে প্রথমে আদালতে দায়মুক্তির জন্য আবেদন করতে হয়। এই পুরো কার্যক্রম আদালতে থাকে এবং দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তিকেই দায়মুক্তির আবেদন করতে হয়। আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তির কাজ হলো আদালত ও রিসিভারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা।

তাকে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কোথায় আছে, ব্যবসার হিসাব বিবরণীসহ সব তথ্য রিসিভারের হাতে তুলে দিতে হয়। রিসিভার সেই সম্পদ বিক্রি করে আদালতের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। সম্পদ বিক্রি করে দায় পরিশোধের পরিমাণ বেশি হলে আদালত তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেন।

আদালত দায়মুক্ত ঘোষণা না করলে তিনি দায়গ্রস্ত দেউলিয়া হিসেবে বিবেচিত হবেন। দেউলিয়া ঘোষিত হলে ব্যক্তির নাগরিক অধিকার সীমিত হয়ে যায়। তিনি শহর এলাকায় তিন হাজার বর্গফুট এবং গ্রাম এলাকায় পাঁচ হাজার বর্গফুটের বেশি সম্পত্তি রাখতে পারেন না। এই সম্পত্তির মূল্য তিন লাখ টাকার বেশি হবে না। পাশাপাশি দেশের বাইরে যাওয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়াসহ মৌলিক অনেক অধিকার থেকেই তিনি বঞ্চিত হন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...