পরিবেশ

বন্যা ও ভাঙন রোধে 'জাদুর ঘাস' বিন্নার ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার

বন্যা ও ভাঙন রোধে 'জাদুর ঘাস' বিন্নার ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার
বন্যা ও ভাঙন রোধে 'জাদুর ঘাস' বিন্নার ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার
বন্যা ও স্রোতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার বিন্না ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক সভায় এর সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয় এবং একটি কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বন্যা ও স্রোতের কারণে প্রতিবছর সড়ক, বাঁধ ও নদীর তীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব স্থাপনা রক্ষায় সাধারণত কংক্রিট, পাথর এবং জিও ব্যাগসহ বিভিন্ন ব্যয়বহুল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এবার সরকার প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এর একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান খুঁজছে।

গভীর ও শক্ত শিকড়ে মাটি আঁকড়ে ধরে রাখা ‘বিন্না ঘাস’কে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রামগঞ্জের পথের ধারে, পরিত্যক্ত জমি কিংবা চরাঞ্চলে এই ঘাস দেখা যায়। মাটির নিচে এর শক্ত ও গভীর শিকড় বন্যার পানি, স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে মাটির ক্ষয় ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সড়ক ও বাঁধের ভাঙন রোধে বিন্না ঘাস ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহ–উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিন্না ঘাস নিয়ে তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। সভায় এই ঘাসের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনা শেষে সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে বিন্না ঘাস ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেন। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কমিটি কোন কোন প্রকল্পে বিন্না ঘাস ব্যবহার করা যেতে পারে, তা পর্যালোচনা করবে।

পাশাপাশি বিন্না ঘাস ব্যবহারের জন্য নীতিমালা প্রণয়নে পরিকল্পনা কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই ঘাস রোপণ শুরু করেছে।

সওজের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত বছর ধরে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিন্না ঘাস রোপণ করা সড়কের পাশ ও ঢালের মাটি ভারী বর্ষণ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মাটির ক্ষয় ও ছোটখাটো ভূমিধসও কমেছে।

বিন্না ঘাসের ইংরেজি নাম ‘ভেটিভার গ্রাস’, বৈজ্ঞানিক নাম ‘ভেটিভেরিয়া জিজানিওইডিস’ বা ‘ক্রাইসোপোগন জিজানিওইডিস’। বাংলায় এটি খাসখাস বা খসখস ঘাস নামেও পরিচিত। কোথাও কোথাও বেন্না বা শণ নামেও এই ঘাস পরিচিত।

গবেষকেরা বিদেশে ‘ভেটিভার’ নামে পরিচিত এই ঘাসকে ‘জাদুর ঘাস’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি পাহাড়ের ক্ষয়রোধে খুব ভালো কাজ করে। বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেন, “বাঁধ ও সড়ক রক্ষায় দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। বিন্না ঘাস দিয়ে কিছুটা ব্যয় কমানো গেলে সরকারের আর্থিক চাপ কমবে।”

মাটির ওপর ঘন গোছায় বেড়ে ওঠা এই ঘাসের মূল শক্তি মাটির নিচে। এর শক্ত ও গভীর শিকড় মাটির কণাকে আঁকড়ে ধরে একধরনের প্রাকৃতিক জালের মতো কাজ করে। এটি পানির প্রবাহ ধীর করে এবং মাটি সহজে সরে যেতে পারে না।

বুয়েটের গবেষণায় বিন্না ঘাসের শিকড় ও মাটির সংযোগকে নোঙরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এটি মাটির কণাগুলো আটকে রেখে মাটির প্রতিরোধী শক্তি বাড়ায়। ঘাসের ঘন গোছা মাটির ওপর একধরনের উদ্ভিদপ্রাচীর তৈরি করে, যা পানির প্রবাহ ধীর করে এবং মাটির পলি ধরে রাখতে সহায়তা করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিন্না ঘাসের শিকড়যুক্ত মাটির গড় সহনশীলতা শিকড়বিহীন মাটির তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে শিকড়যুক্ত মাটি শিকড়বিহীন মাটির তুলনায় ৫১৫ শতাংশ বেশি বিকৃতি সহ্য করতে পারে। এর অর্থ হলো, বিন্না ঘাসের শিকড় শুধু মাটির শক্তিই বাড়ায় না, চাপ ও নড়াচড়ার বিরুদ্ধে মাটির সহনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

বিন্না ঘাসের ব্যবহার নিয়ে দেশে পরীক্ষামূলক কাজ নতুন নয়। এলজিইডি ২০২১-২২ অর্থবছরে সারা দেশে ১৭১ কিলোমিটার সড়কে বিন্না ঘাস রোপণ করেছিল। সংস্থাটি এখন সারা দেশের সড়কে এর ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

বিন্না ঘাস কঠিন জলবায়ু ও বিভিন্ন ধরনের মাটিতে টিকে থাকতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের মতো বিশ্বের শতাধিক দেশে ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ ও ঢাল স্থিতিশীল রাখতে এই ঘাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশেও এর স্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেছে।

সওজ কয়েক বছর ধরে ঘাসটির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করছে। ‘কুমিল্লা (টমছম ব্রিজ)-নোয়াখালী (বেগমগঞ্জ) আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে সড়কের পাশের শোল্ডার ও ঢালে প্রায় সাড়ে ৩০০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস রোপণ করা হয়। সওজ সূত্রে জানা গেছে, রোপণের সময় ঘাসগুলোর উচ্চতা ছিল ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে সেগুলো প্রায় ৩ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং আশপাশে বীজ ছড়িয়ে প্রাকৃতিকভাবেও ঘাসের বিস্তার ঘটেছে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এতে সড়কের পাশ ও ঢালের স্থায়িত্ব বেড়েছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় কমেছে। এটি রোপণ একটি গুরুত্বপূর্ণ, কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক পদ্ধতি হতে পারে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পেও বিন্না ঘাস রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ আহম্মদ খান বলেন, “বিন্না ঘাস দেশীয় বা নেটিভ আগ্রাসী উদ্ভিদ। এর গভীর, ঘন শিকড় প্রচুর পরিমাণে মাটির পুষ্টি এবং আর্দ্রতা দ্রুত শোষণ করে, যার ফলে এর আশপাশের অন্যান্য দেশীয় উদ্ভিদগুলো পুষ্টিহীন হয়ে যেতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।”

এদিকে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত পানি ভবনে ‘বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ’বিষয়ক সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, নদীভাঙন, মাটির ক্ষয় ও ভূমির অবক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব সমাধান।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...