রাজনীতি

বর্তমান বাজারদরে মজুরি নির্ধারণ ও শ্রম আইন সংস্কারের দাবি

বর্তমান বাজারদরে মজুরি নির্ধারণ ও শ্রম আইন সংস্কারের দাবি
বর্তমান বাজারদরে মজুরি নির্ধারণ ও শ্রম আইন সংস্কারের দাবি
রাজবাড়ীতে শ্রমিক সমাবেশে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ ও ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে শ্রম আইন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাজবাড়ীতে এক শ্রমিক সমাবেশে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে দেশের শ্রম আইন সংস্কারেরও আহ্বান জানান। নান্নু টাওয়ার কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে দেশের শ্রম আইন গঠন করতে হবে।

তিনি সম্প্রতি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মজুরি কাঠামোর সমালোচনা করেন। বর্তমান বাজারদর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতায় এই মজুরি নির্ধারণকে তিনি হাস্যকর বলে অভিহিত করেন। একটি পরিবারের মাসিক খরচ এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা না করে পুরোনো ফরমুলায় মজুরি নির্ধারণকে তিনি বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেন।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে আতিকুর রহমান বলেন, তাদের জন্য সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক খরচ ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এই মজুরি নির্ধারণকে তিনি অমানবিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, দেশে কলকারখানা ও শিল্পকারখানা বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সেভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না।

শ্রমিকদের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো অর্জন নেই, যে অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের ভূমিকা নেই। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সবকিছুর সঙ্গে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িত। তিনি ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন ক্রান্তিকালে শ্রমিকদের অগ্রভাগে থেকে লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করেন।

রাজবাড়ীর কৃষি শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জেলার কৃষি শ্রমিকরা মাঠে ফসল ফলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এমনকি বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করেও তারা কৃষিকাজ করে যাচ্ছেন। তবে তাদের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের শ্রম দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রবাসী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার কথাও তিনি তুলে ধরেন। পরিবহন, নির্মাণসহ দেশের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে শ্রমিকদের অবদান নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। একসময় শ্রমিকদের দাসের মতো ব্যবহার করা হতো এবং তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা মজুরির কোনো বিধান ছিল না বলেও তিনি জানান।

শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে এখনো অনেক শ্রমিক আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টা থেকে বঞ্চিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। শ্রমিকদের দিয়ে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হলে অবশ্যই ওভারটাইমের মজুরি দিতে হবে বলেও তিনি জানান। রাষ্ট্রের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চা শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার বিষয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের মজুরি, চিকিৎসা, পুষ্টি ও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠলেই অনেক ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে, ফলে ভয়ে অনেক শ্রমিক তাদের অধিকারের কথা বলতে পারেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সমাবেশে জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট রনজু বিশ্বাস সভাপতিত্ব করেন এবং জেলা সাধারণ সম্পাদক কবির উদ্দীন সঞ্চালনা করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, বিআরইএল কেন্দ্রীয় সভাপতি আক্তারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, কেন্দ্রীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্পাদক এসএম শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সম্পাদক গোলাম রসুল খান, বাংলাদেশ পরিবহন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, উপদেষ্টা হাসমত আলী হাওলাদার ও আলীমুজ্জামান।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম শ্রমিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠন দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার আদায় এবং শ্রমিকের মুক্তির জন্য লড়াই করে আসছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...