ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জামিন ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষ সচেষ্ট এবং দ্রুত বিচার আইন প্রয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট রয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আনা মামলাগুলোতে জামিন ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকি জানান, ছিনতাই প্রতিরোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিচারকরাও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের জামিনের কঠোর বিরোধিতা করা হচ্ছে।
পিপি ফারুকি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছে। তাদের উচিত হবে কোনো ভাসমান সাক্ষী না রেখে স্থায়ী বাসিন্দাদের সাক্ষী হিসেবে রাখা। এতে মামলাগুলো প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষের সুবিধা হয়, কারণ ভাসমান সাক্ষীদের অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না।
তিনি উল্লেখ করেন, ছিনতাইকারীদের আটক রাখতে বিচারকরা সচেষ্ট এবং রাষ্ট্রপক্ষও সক্রিয়। সরকার ছিনতাই ও ডাকাতি মামলাগুলোতে বিশেষ নজর দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো: আকতার হোসেন বলেন, বেশিরভাগ ছিনতাইকারীই পেশাদার ও একাধিক মামলার আসামি। তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধ করে। ছিনতাইয়ের মামলাগুলো এখন নিয়মিত মামলার পাশাপাশি দ্রুত বিচার আইনেও দেওয়া হচ্ছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার আকতার হোসেন জানান, দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়েরের ফলে জামিন পাওয়া কঠিন হয় এবং দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা যায়। তিনি নগরবাসীকে ছিনতাইয়ের শিকার হলে সাথে সাথে ৯৯৯-এ কল করে থানায় মামলা করার অনুরোধ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খালিদ হোসাইন বলেন, দণ্ডবিধিতে শাস্তি বেশি হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা ভয় পায় না। দ্রুত বিচার আইনে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকায় এটি ছিনতাই প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এই আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
ছিনতাই প্রতিরোধে দণ্ডবিধির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই আইনটি জামিন অযোগ্য ধারা থাকায় অপরাধীরা সহজে জামিন পায় না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আনা মামলার রায় দ্রুত বিচারে নিশ্চিত হলে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সুফল আসবে বলে আইনজীবীরা মনে করেন।
‘ছিনতাই’ শব্দটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ ‘দস্যুতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৯০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি চুরি করতে গিয়ে বা চুরির উদ্দেশ্যে অপরাধী স্বেচ্ছায় কাউকে আঘাত করে, আঘাত করার চেষ্টা করে বা অবৈধভাবে আটক করে বা আটকের চেষ্টা করে, তবে তা দস্যুতা বলে গণ্য হবে।
এই ধারায় দস্যুতার জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৩৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, দস্যুতা করার সময় যদি অপরাধী কাউকে আঘাত করে, তাহলে তার জন্য ২০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ক্ষেত্র বিশেষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতের ঘটনাগুলো এই ধারায় পড়ে।
দণ্ডবিধির ৩৯৭ ও ৩৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, দস্যুতা বা ডাকাতির সময় যদি অপরাধী মৃত্যু বা গুরুতর জখম করার চেষ্টা করে এবং এ সময় সে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে, তবে তার জন্য ন্যূনতম ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীদের দণ্ডবিধি আইন ও দ্রুত বিচার আইনের আওতায় দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
অ্যাভোকেট সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বলেন, ছিনতাই জনজীবনে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ছিনতাই মামলাগুলো দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ মামলায় সাক্ষীদের ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এই আইনজীবী আরও বলেন, জামিনের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা ফলপ্রসূ হতে পারে। কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও প্রকৃত ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনাই মুক্তির পথ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি সাক্ষীদের যাতায়াত খরচ কোর্টের মাধ্যমে সাথে সাথে দিলে সাক্ষী নিয়মিত আসবে। কারণ তাদের নিজ খরচে আসতে হয় ও টিএ ডিএ পেতে সময় লাগে। পাবলিক প্রসিকিউটরদেরও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
মতামত (0)