বিনোদন

চলচ্চিত্রে আবেগঘন প্রেম: দর্শক আকর্ষণ ও বক্স অফিসের গুরুত্ব

চলচ্চিত্রে আবেগঘন প্রেম: দর্শক আকর্ষণ ও বক্স অফিসের গুরুত্ব
চলচ্চিত্রে আবেগঘন প্রেম: দর্শক আকর্ষণ ও বক্স অফিসের গুরুত্ব
দর্শকের কাছে আবেগঘন প্রেম ও সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব এখন সিনেমার মূল আকর্ষণ। রোমান্টিক গল্প দর্শককে নিজেদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে, যা বক্স অফিসে সাফল্য এনে দেয়।

দর্শক বর্তমানে সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব দেখতে চায়। তারা আবেগ, সম্পর্কের দ্বন্দ্ব এবং নিজেদের খুঁজে পাওয়ার মতো প্রেম দেখতে আগ্রহী। বিশ্বের অন্যান্য চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি রোমান্টিকতার মনস্তত্ত্বকে সিনেমায় তুলে ধরা না যায়, তবে দর্শক আকর্ষণ করা কঠিন হতে পারে।

চলচ্চিত্রের কারিগরি দিক যতই উন্নত হোক না কেন, প্রতিটি সিনেমা মুক্তির পর একটিই প্রশ্ন আসে, দর্শক কি টিকিট কাটবে? এই ক্ষেত্রে প্রেমের গল্পের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সুবিধা রয়েছে। দুটি মানুষের একে অপরের প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের আলাদা করে রাখা বাধাগুলো দর্শককে জানতে আগ্রহী করে তোলে যে তারা শেষ পর্যন্ত এক হবে কিনা। দর্শক নিজেদের এই গল্পগুলোতে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে।

বড় পর্দায় কয়েকশ দর্শক মুখোমুখি। আলো নিভে যাওয়ার পর পর্দায় দুজন মানুষ মুখোমুখি হয়। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার মধ্যে হলভর্তি মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে। এই অপেক্ষার মধ্যেই সিনেমার এক আশ্চর্য শক্তি লুকিয়ে থাকে।

একটি বিস্ফোরণ দর্শককে চমকে দিতে পারে, বা হত্যার দৃশ্য আতঙ্কিত করতে পারে। রাজনৈতিক বক্তব্য দর্শককে চিন্তা করতে বাধ্য করতে পারে। তবে দুজন মানুষের একে অপরের দিকে তাকানোর দৃশ্য অনেক সময় দর্শককে নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। পর্দার মানুষ দুজন তখন কেবল পর্দার চরিত্র থাকে না।

দর্শক তাদের মধ্যে নিজের প্রথম প্রেম, হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষ, বলা হয়নি এমন কোনো কথা, কিংবা এমন একটি সম্পর্ক দেখতে পায় যার কোনো শেষ দৃশ্য কখনো লেখা হয়নি। এই কারণেই সিনেমায় প্রেম কোনো অতিরিক্ত উপাদান নয়। এটি অনেক সময় গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগগত ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও প্রেম কোনো নতুন সংযোজন নয়। মূলধারার চলচ্চিত্রে প্রেম দীর্ঘদিন ধরে গল্প বলার অন্যতম কেন্দ্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর শক্তিশালী উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘বেদের মেয়ে জোছনা’।

১৯৮৯ সালের এই চলচ্চিত্রে বেদে সম্প্রদায়ের মেয়ে জোছনা এবং রাজপুত্র আনোয়ারের প্রেমকে কেন্দ্র করে সামাজিক অবস্থান, রাজশক্তি ও ভালোবাসার সংঘাত তৈরি হয়েছিল। মুক্তির পর এটি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্র হিসেবে রেকর্ড ধরে রেখেছিল। মূল্যস্ফীতি হিসাব না করলে ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ সেই রেকর্ড অতিক্রম করে বলে বলা হয়।

২০০৯ সালে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ প্রমাণ করে যে, প্রেমের গল্পকে বড় বাজেট, শহুরে চাকচিক্য বা প্রচলিত বাণিজ্যিক ফর্মুলা ছাড়াই দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। চঞ্চল চৌধুরী ও ফারহানা মিলি অভিনীত এই গ্রামীণ প্রেমের ট্র্যাজেডি সমালোচক ও সাধারণ দর্শক উভয় মহলেই ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল।

সিনেমাটি মুক্তির আগে এর গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যসহ পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।

মানুষ পর্দায় প্রেম দেখে এবং কখনো কখনো সেই প্রেমকে নিজের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে। সিনেমার নায়ক কি সবসময় ফিরে আসে? প্রেম কি সব বাধা জয় করে? একজন মানুষ কি সত্যিই ‘একজনের জন্যই তৈরি’? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ‘রোমান্টিক মিডিয়া’ মানুষের ‘রোমান্টিক বিশ্বাস’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

২০১৪ সালের একটি গবেষণায় ৬২৫ জন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর ওপর করা জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ‘রোমান্টিক স্ক্রিন মিডিয়া’ ভিন্ন ভিন্ন রোমান্টিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। রোমান্টিক ঘরানার সিনেমা বেশি দেখার সঙ্গে ‘প্রেম একটি পথ খুঁজে নেয়’ এমন বিশ্বাসের সম্পর্ক পাওয়া যায়। এটি মানুষের ভেতরের আবেগ অনুভূতিগুলোকে আরো ইতিবাচক দিকে চালিত করে।

একটি রোমান্টিক সিনেমার প্রচার অন্য অনেক ঘরানার সিনেমার প্রচার থেকে আলাদা হতে পারে। থ্রিলার বিক্রি করতে রহস্য দেখানো যায়, হরর বিক্রি করতে ভয় দেখানো যায়। কিন্তু রোমান্স বিক্রি করতে হলে অনুভূতি বিক্রি করতে হয়।

এখানে দুজন অভিনেতার রসায়ন দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ স্বভাবতই আবেগপ্রবণ, তাই একটি ট্রেলারে যখন প্রেমের কোনো দৃশ্যের অংশবিশেষ দেখানো হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের ‘দরদ’ সিনেমার ক্ষেত্রেও মুক্তির আগে গান ও ট্রেইলার প্রকাশ, মাল্টিপ্লেক্সে অগ্রিম টিকিট বিক্রি এবং ১০০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়েছিল।

এই ক্ষেত্রে রোমান্টিক ঘরানা কেবল শৈল্পিক অভিব্যক্তি নয়। এটি প্রচারের একটি কৌশল, যা একটি সিনেমার সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বাংলাদেশি দর্শকের দেখার অভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় প্রেক্ষাগৃহ ছিল সিনেমা দেখার প্রধান মাধ্যম। এখন ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং ফেসবুকও দর্শকের সময় দখল করছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...