জাতীয়

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষার্থী কর্তৃক ভাঙচুর ও প্রশাসনের তদন্ত কমিটি

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষার্থী কর্তৃক ভাঙচুর ও প্রশাসনের তদন্ত কমিটি
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক, শিক্ষার্থী কর্তৃক ভাঙচুর ও প্রশাসনের তদন্ত কমিটি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এক শিক্ষার্থী ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি নতুন করে প্রদর্শন করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরের পর, আনুমানিক বেলা আড়াইটার দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় টানানো জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।

শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দিনভর চলা এই প্রতিবাদ ও সমালোচনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার বিরল আলোকচিত্র, পেপার কাটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিল ডাকসু সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। সংগ্রহশালাটি সংস্কারের পর গত রোববার এটি পুনরায় চালু করা হয়। এই উদ্বোধনের সঙ্গেই নতুন করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি সংগ্রহশালায় স্থান পায়।

সংগ্রহশালায় যুক্ত হওয়া ছবিগুলোর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) একটি অনুষ্ঠানে জিন্নাহর একটি ছবি ছিল। এই অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এছাড়াও ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি এবং ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের একটি পেপার কাটিং সেখানে রাখা হয়।

ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবিও নতুন করে সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি এবার সংগ্রহশালায় স্থান পায়নি, যা আগে সেখানে প্রদর্শিত হতো। এই বিষয়গুলোও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

জিন্নাহর ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখার খবরটি জানাজানি হওয়ার পর গত রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেক ব্যবহারকারী ফেসবুকে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন পোস্ট দেন এবং এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

আবু তৈয়ব সাংবাদিকদের কাছে তার প্রতিবাদের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, যে জিন্নাহ মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এবং ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেপ্তার করেছিলেন, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারেন না। তার এই বক্তব্য ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরে।

জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনার পর ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, জিন্নাহর ছবি রাখার পাশাপাশি ছবির নিচে তার বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছিল।

এস এম ফরহাদ দাবি করেন, যদি জিন্নাহর ছবি দেওয়া না হতো, তাহলে বলা হতো যে তার (জিন্নাহ) বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান লুকানো হয়েছে। তিনি ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, যিনি ছবিটি ছিঁড়েছেন, তিনি উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় জিন্নাহর প্রতি আলাদা দরদ থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।

গতকাল সোমবার বিকেল তিনটার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী একটি প্রতিবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জিন্নাহর ছবি যেখানে লাগানো হয়েছিল, তার ঠিক ওপরে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি সাঁটিয়ে দেওয়া হয়।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জিন্নাহর বিতর্কিত ছবি প্রদর্শনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অঙ্গসংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। ছাত্রদল এই ছবিটি অপসারণ এবং ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ প্রচারের স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটি এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে দেওয়া ইতিহাস বিকৃতির শামিল। তারা দ্রুত জিন্নাহর ছবি অপসারণ ও শেখ মুজিবের ছবি পুনর্বহাল না হলে শিক্ষার্থীরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে উল্লেখ করেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...