জাতীয়ডেঙ্গু রোগীদের ভুল সিবিসি রিপোর্ট, বাড়ছে উদ্বেগ
ডেঙ্গু রোগীদের ভুল সিবিসি রিপোর্ট, বাড়ছে উদ্বেগ
ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিবিসি পরীক্ষায় ভুল ফলাফল আসছে, যা রোগীদের চিকিৎসায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক ঘটনায় একই রোগীর তিনটি সিবিসি রিপোর্টে প্লেটিলেটসহ বিভিন্ন উপাদানে অস্বাভাবিক পার্থক্য দেখা গেছে।
ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষার ফলাফলে ভুল আসছে বলে জানা গেছে। এর ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ঝুঁকিতে পড়ছে। গত কয়েক বছর ধরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ আসার ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি ৩১ বছর বয়সী এক নারী জ্বরে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক তাকে সিবিসি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। প্রথম পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসকের প্রত্যাশিত না হওয়ায় তাকে পুনরায় পরীক্ষা করানো হয়। পরবর্তীতে আরও নিশ্চিত হতে ওই রোগী নিজেই তৃতীয়বারের মতো সিবিসি পরীক্ষা করান।
তিনটি পরীক্ষার ফলাফলে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। ওই রোগীর শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭.১৫, ৬.৬৩ ও ৬.৮৪। লোহিত রক্তকণিকা পাওয়া যায় ৩.১৪, ৩.৩৪ ও ৩.১২।
হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৮.৬, ৯.০ ও ৮.৩। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পার্থক্য দেখা গেছে প্লেটিলেটের হিসাবে, যা ছিল যথাক্রমে ৭, ১৫ ও ৭। প্লেটিলেট ভলিউমের ফলাফলও ছিল যথাক্রমে ০, ৮.৪ ও ১৪.৪, যা প্রতিটি রিপোর্টেই ভিন্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন রোগীর ক্ষেত্রে পরপর করা সিবিসি পরীক্ষায় এমন অস্বাভাবিক পার্থক্য গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর মতো রোগে প্লেটিলেট কাউন্ট চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল রিপোর্ট রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, রক্তের নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন থেকে শুরু করে পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া এবং যন্ত্রের ত্রুটি—যেকোনো পর্যায়ে সমস্যা হলে ভুল ফলাফল আসতে পারে। বিশেষ করে প্লেটিলেটের সংখ্যা ভুলভাবে কম দেখালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রোগী মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিবিসি পরীক্ষার ফলাফল রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তাই ফলাফলে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে যাচাই না করে রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত নয়।
চিকিৎসকের সন্দেহ হলে নমুনা ও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। চিকিৎসকরা ডেঙ্গু পরীক্ষার সঠিক সময় সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছেন। ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর অর্থাৎ জ্বর হওয়ার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করলে পজিটিভ হতে পারে।
এরপর অর্থাৎ ৫-৬ দিন পর পরীক্ষা করলে এনএস-১ নেগেটিভ আসে। ৭ম দিনে আইজিএম পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। এর দুই দিন পর আইজিএম নেগেটিভ আসবে এবং তখন আইজিজি পরীক্ষা করতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, সবার সক্ষমতা একরকম নয়, তাই শরীরে ভাইরাস ঢুকলেও জ্বর পরে আসতে পারে। জ্বরের ৪, ৫ ও ৬ -এই দিনগুলোকে ‘উইন্ডো পিরিয়ড’ বলা হয়, যা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হুমায়রা বিনতে আসাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সিবিসি পরীক্ষায় রক্তের নমুনা সংগ্রহে ইডিটিএ টিউব ব্যবহার করা হয়। এই টিউবে রক্ত সঠিকভাবে মিশ্রিত করে এক ঘণ্টার মধ্যে অ্যানালাইজারে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
অধ্যাপক হুমায়রা বিনতে আসাদ আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকতে পারে। মেশিন ক্যালিব্রেশন করা না থাকলেও রিপোর্টে ভুল আসতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, রোগীর কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করেন নার্স বা টেকনোলজিস্ট এবং পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করেন টেকনোলজিস্ট।
এসব কর্মী যথাযথ প্রশিক্ষিত না হলে পরীক্ষার ফলাফল সঠিক নাও হতে পারে। তিনি এটিকে একটি চেইন অব প্রসেস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এক্ষেত্রে কোনো একটি জায়গায় ত্রুটি হলেই রিপোর্টে সঠিক তথ্য নাও আসতে পারে।
নমুনা সংগ্রহেও ত্রুটি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সিবিসি সাধারণত ইডিটিএ (ইডিথিলিনডায়ামিনটেট্রাঅ্যাসেটিক অ্যাসিড) যুক্ত টিউবে রক্ত সংগ্রহ করে করা হয়। রক্ত নেওয়ার পর টিউবটি যথাযথভাবে মিশ্রিত না হলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে।
প্লেটিলেট জমাট বাঁধলে স্বয়ংক্রিয় অ্যানালাইজার প্লেটিলেটের প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে গণনা করতে পারে না। ফলে প্লেটিলেটের সংখ্যা ভুলভাবে কম দেখাতে পারে। এ অবস্থাকে সিউডোথ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলা হয়।
আবার টিউবটি খুব জোরে ঝাঁকালে হিমোলাইসিসের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া কঠিনভাবে রক্ত সংগ্রহ করা, সিরিঞ্জ থেকে জোর করে রক্ত টিউবে ঢোকানো, প্রয়োজনের তুলনায় কম রক্ত নেওয়া এবং দীর্ঘ সময় টর্নিকেট লাগিয়ে রাখাও ত্রুটির কারণ হতে পারে।
আইভি ফ্লুইড চলমান হাত বা তার কাছাকাছি স্থান থেকে নমুনা নেওয়া এবং নমুনা সংগ্রহের পর দ্রুত ল্যাবরেটরিতে না পাঠানো—এসব কারণেও পরীক্ষার ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। অ্যানালাইজার যত আধুনিকই হোক না কেন, নমুনা ত্রুটিপূর্ণ হলে রিপোর্টও নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ইডিটিএ টিউবে রক্ত সংগ্রহ করার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে থাকে। এটিও পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মতামত (0)