জাতীয়

দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা: জ্বর-কাশি রোগীদের ১৩ শতাংশ আক্রান্ত

দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা: জ্বর-কাশি রোগীদের ১৩ শতাংশ আক্রান্ত
দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা: জ্বর-কাশি রোগীদের ১৩ শতাংশ আক্রান্ত
বিশ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে জ্বর, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ১৩ শতাংশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সমস্যা।

দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ বছরের পর্যবেক্ষণ বলছে, সাধারণ জ্বর, কাশি এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ১৩ শতাংশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। একই পর্যবেক্ষণে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ২০০৭ সাল থেকে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এই কাজে তাদের সহযোগিতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। গতকাল মঙ্গলবার আইইডিসিআরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।

অনুষ্ঠানে ওই চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেশ কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং সরকারি ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাহমিদ আহমেদ আরও বলেন, এই উদ্যোগ বৈশ্বিক রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে সহায়তা করছে। তিনি উল্লেখ করেন, টিকা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের একটি উপায়। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা এবং নিয়মিত হাত ধোয়া গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।

মূল উপস্থাপনায় আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক মোনালিসা ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পটভূমি, পদ্ধতি, গুরুত্ব এবং উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালে দেশে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়।

মোনালিসা বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বোঝা। তিনি আরও জানান, বিশ্বে ১৩৮টি দেশে ১৫৭টি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টার আছে, যার মধ্যে আইইডিসিআর একটি।

আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবি ১৫টি সরকারি এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০ বছর ধরে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা এবং মারাত্মক তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে আসা রোগীর পর্যবেক্ষণ করেছে। এই হাসপাতালগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল। এছাড়া যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও এই পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল।

গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও এই পর্যবেক্ষণে অংশ নেয়। সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা এবং শরীরে ব্যথা। আক্রান্ত মানুষের হাঁচি, কাশি থেকে বা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলে ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়ায়।

ওই হাসপাতালগুলোতে গত ২০ বছরে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা বা তীব্র শ্বাসজনিত সংক্রমণ নিয়ে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়। তাদের প্রত্যেকের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২২ হাজার ২৮৪ জনের বা ১৩ শতাংশের ইনফ্লুয়েঞ্জা ছিল।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি হয়। তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি।

সাধারণত ধারণা করা হয়, শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি দেখা দেয়। তবে ২০ বছরের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম। জুন-জুলাই মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়।

ফাহমিদা চৌধুরী আরও বলেন, পাঁচ ধরনের মানুষের ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি বেশি। এই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, একই সঙ্গে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা মানুষ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ অন্তর্ভুক্ত।

সেমিনারে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। গবেষকেরা এবং মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা ঝুঁকি বেশি এমন পাঁচ ধরনের মানুষকে টিকা দেওয়া বা টিকার আওতায় আনার ব্যাপারে বক্তব্য দেন। তবে দেশের সব মানুষকে প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন মত শোনা যায়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...