ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে একীভূত করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি উদ্যোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভিন্নমত পোষণ করছেন। অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশের পর আপত্তি ও বিক্ষোভ চলছে।
ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজ নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। সরকার এসব কলেজকে একীভূত করে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা দিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করেছে। প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম 'ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি'। সাতটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠকেন্দ্র বা একাডেমিক ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি ক্যাম্পাসে আলাদা আলাদা বিষয়ে শিক্ষাদান করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি 'হাইব্রিড' পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে এবং বাকিগুলো সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষাগুলো সশরীরেই নেওয়া হবে।
শিক্ষকেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে নন, তবে তাঁরা প্রস্তাবিত কাঠামোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই কাঠামোতে উচ্চশিক্ষা ও নারী শিক্ষার সংকোচন হতে পারে। এতে কলেজগুলোর স্বতন্ত্র কাঠামো ও ঐতিহ্য বিলুপ্তির পাশাপাশি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পদও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর বিরুদ্ধে সাত কলেজের শিক্ষকেরা সম্প্রতি নিজ নিজ কলেজে মানববন্ধন করেছেন। শিক্ষকেরা একটি পৃথক স্থানে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে এই সাতটি কলেজে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী এবং হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। কলেজগুলোর মধ্যে ইডেন মহিলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ানো হয়। বাকি পাঁচটি কলেজে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং উচ্চমাধ্যমিক পড়ানো হয়।
উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রস্তাবিত কাঠামোয় উচ্চমাধ্যমিক স্তর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি কলেজের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই কাঠামোতে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, কলেজগুলোর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দাবিতে আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছেন।
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান জানিয়েছেন, তাঁদের দায়িত্ব ছিল অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা। পরবর্তী পদক্ষেপ শিক্ষা মন্ত্রণালয় নেবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, খসড়া নিয়ে সাত কর্মদিবসের মধ্যে মতামত দেওয়া যাবে এবং এরপর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানের কাঠামো অনুযায়ী কলেজগুলো আগামী কয়েক বছর চলবে। ২০১৭ সালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল, যা তখন থেকেই সংকট তৈরি করে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অধিভুক্তি বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বর্তমানে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষকে প্রশাসক করে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় সাত কলেজের কার্যক্রম চলছে।
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চারটি ভাগে চলবে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল অব সায়েন্স, স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিস, স্কুল অব বিজনেস এবং স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিস। 'স্কুল' বলতে মূলত অনুষদের বিকল্প ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে 'হেড অব স্কুল' দায়িত্ব পালন করবেন।
স্কুল অব সায়েন্সের আওতায় ঢাকা কলেজে ফলিত গণিত, প্রাণিবিদ্যা, ডেটা সায়েন্স, প্রাণরসায়ন ও জৈবপ্রযুক্তি বিষয় চালু করা যাবে। ইডেন মহিলা কলেজে পদার্থবিদ্যা, ফলিত রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, ফরেনসিক সায়েন্স এবং বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজে মনোবিজ্ঞান ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয় থাকবে।
স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের আওতায় বাঙলা কলেজে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ অধ্যয়ন, উন্নয়ন অধ্যয়ন, অর্থনীতি, চলচ্চিত্র অধ্যয়ন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়গুলো চালু করা যাবে। স্কুল অব বিজনেসের আওতায় তিতুমীর কলেজে হিসাববিজ্ঞান, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস, ব্যাংক অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স ম্যানেজমেন্ট বিষয় থাকবে।
স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিসের আওতায় কবি নজরুল সরকারি কলেজে আইন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজে অপরাধবিজ্ঞান বিষয় চালু করা যাবে।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে 'ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি' নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অধ্যাদেশ জারি করে। এরপর নতুন সরকারের শপথের দুদিন আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্যও নিয়োগ করে যাওয়া হয়।
নতুন শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, সাত কলেজের জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি একটি কমিটি করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করা হয়েছে কিনা, তা পর্যালোচনায় আনা হচ্ছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের সাতটি কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে 'সংযুক্ত' কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কাগজপত্রে ভিন্নতা থাকলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হবে। কলেজগুলোর পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি সংযুক্ত কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠদানপ্রক্রিয়া নির্ধারণসহ শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন বিষয় দেখবে। স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পর্যায়ের কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার বিধান অনুসরণ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট এবং একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি সিনেট মনোনীত তিনজনের প্যানেল থেকে একজনকে চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বা সংযুক্ত কলেজগুলোর স্কুল বা ডিসিপ্লিনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনারও বিধান রয়েছে।
মতামত (0)