সারাদেশ

এআই কূটনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ

এআই কূটনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ
এআই কূটনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে একটি রোডম্যাপ তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মূল চালিকাশক্তি ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পদক্ষেপ নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি’ (আইটিআইটি) উইং গত ২৭ জুলাই “ন্যাশনাল এআই গভর্নেন্স অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি ২০২৬” বিষয়ক দ্বিতীয় জাতীয় ভার্চুয়াল টাউনহলের আয়োজন করে। এই টাউনহলে একটি যুগান্তকারী রোডম্যাপ ও কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অণুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন এতে সভাপতিত্ব করেন।

এআই প্রযুক্তি তৈরির আর্থিক সংকট মেটাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং, যেখানে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সংমিশ্রণ ঘটানো হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে এন্টারপ্রাইজ কানেক্টের মাধ্যমে যৌথভাবে ব্যবহারযোগ্য সরকারি-বেসরকারি জিপিইউ কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বায়োইনফরমেটিক্স ও সায়েন্টিফিক এআই উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট বিক্রি বা বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে আইপি মনিটাইজেশনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ক্যানভা-এর প্রতিনিধি সাগারী চ্যাটার্জি এবং মেগান টাউন্স জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ক্যানভা এডুকেশন’-এর প্রিমিয়াম সুবিধা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের ইংলিশ অ্যান্ড স্কুল এডুকেশন প্রধান দীপ্তি দাস সরকারের কারিকুলাম সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

ডি-রেডি ইউকে-এর প্রধান নির্বাহী ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, কেবল সেমিনার বা নথিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, লক্ষ্যভিত্তিক সুস্পষ্ট ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে হবে। তিনি আরও জানান, উদ্ভাবকদের জন্য ‘রাইজ-মি’ নামক একটি এআই টিউটরিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনএনআরসি-এর এএইচএম বজলুর রহমান মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরিকে কেবল ঠুটো জগন্নাথ বা ক্ষমতাহীন উপদেষ্টা পরিষদ বানালে চলবে না। তিনি বলেন, এর নিজস্ব সচিবালয়, বাজেট এবং সাধারণ নাগরিক ও গিগ-ওয়ার্কারদের অধিকার সুরক্ষার আইনি ক্ষমতা থাকতে হবে।

টাউনহলে কেবল উচ্চপর্যায়ের কূটনীতি নয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার দিকেও জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশ উইমেন আইজিএফ-এর সভানেত্রী শামীমা আক্তার নারী ও শিশু সুরক্ষায় জোর দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা এবং ডিপফেক প্রতিরোধে কঠোর আইনের দাবি জানান। বাংলাদেশ কিডস আইজিএফ-এর আয়েশা লাবিবা শিশুদের পলিসি তৈরিতে নিষ্ণিয় সুবিধাভোগী না বানিয়ে সক্রিয় অংশীদার বানানোর আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকারের আইসিটি ডিভিশন এবং বিভিন্ন এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সূত্র জানায়, একটি বিশ্বমানের সার্বভৌম জাতীয় এআই ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৫০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬,০০০ থেকে ৯,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুপারকম্পিউটিং জিপিইউ ক্লাস্টার গঠনেই অর্ধেকের বেশি খরচ হবে।

একটি মানসম্পন্ন আঞ্চলিক ও নিজস্ব এআই মডেল গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ সার্ভিস, এপিআই এবং লাইসেন্সিং ফি থেকে বছরে আনুমানিক ১.৫ থেকে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা। তবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ‘এআই ইনোভেশন ফান্ড’-এ মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

প্রযুক্তিবিদ ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এআই প্রযুক্তিকে একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক অঙ্গনে মিত্রতা বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হতে পারে।

এআই প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘে দাবি উত্থাপন করে বাংলাদেশ ‘গ্লোবাল সাউথ’ ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইইউ-এর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল তৈরি পোশাক বা সাহায্য না চেয়ে ‘অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং পাওয়ার’ এবং ‘এআই ট্রেনিং ডাটা’ বিনিময়ের শর্ত যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ সার্ক ও বিমসটেক অঞ্চলের জন্য বাংলা ও স্থানীয় ভাষার এআই মডেল ডেভেলপমেন্টের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক এআই হাব তৈরির সুযোগ রয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, সরকারের আইসিটি ডিভিশনের “জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০”-এর অধীনে সাতটি নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিশাল সুপারকম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। অথচ আগামী পাঁচ বছরের জন্য ‘এআই ইনোভেশন ফান্ড’-এ বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা। এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের এআই প্রযুক্তির জন্য বার্ষিক বরাদ্দের চেয়ে কয়েকগুণ কম।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...