সারাদেশ

ইলিশ আহরণ বাড়লেও নিষেধাজ্ঞার চাপে জেলেরা

ইলিশ আহরণ বাড়লেও নিষেধাজ্ঞার চাপে জেলেরা
ইলিশ আহরণ বাড়লেও নিষেধাজ্ঞার চাপে জেলেরা
মৌসুমের শেষ সময়ে ইলিশের আহরণ বাড়লেও ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জেলেরা নিষেধাজ্ঞা পেছানোর দাবি জানিয়েছেন।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাগর ও নদীতে গত আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ইলিশ মৌসুমে ইলিশের তেমন দেখা মেলেনি। তবে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসে ইলিশের আহরণ হঠাৎ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত (২২ দিন) ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে।

মৎস্যজীবীরা বলছেন, মৌসুমের শেষ সময়ে যখন ইলিশের প্রাচুর্য দেখা দিয়েছে, তখনই নিষেধাজ্ঞা আসছে। এতে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। তাঁরা ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কমপক্ষে ১০ দিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য আড়তদার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই মোকামে ১ হাজার ২৮০ মণ ইলিশ এসেছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৬০ মণ ইলিশ পাওয়া গেছে। এর আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ মণ ইলিশ এসেছিল।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের সরবরাহ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে ইলিশের দামও কমেছে, মণপ্রতি ১৪ থেকে ৩০ হাজার টাকা হ্রাস পেয়েছে। ৭ দিন আগে দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

একইভাবে, ১ কেজি থেকে ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থেকে কমে ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি জহির শিকদার জানিয়েছেন, গত বছর ৪ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা বন্ধ হয়েছিল।

জহির শিকদার আরও বলেন, এবার কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় তাঁরা ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে কমপক্ষে ১০ দিন সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। তাঁর মতে, এখনো ইলিশের পেটে ডিম আসেনি এবং অক্টোবরের শেষ দিকে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে ইলিশের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে।

ভোলা সদর উপজেলার জেলে আলাউদ্দিন বলেন, এবার প্রত্যাশিত ইলিশ ধরতে না পারায় তাঁর ধারদেনা শোধ হয়নি। আর মাত্র সাত দিন পরই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে, যা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তিনি জানান, "মাছ ধরতে হাজার টাহা ডিজেল কিনতেই খরচ হয়, গাঙেরটা গাঙেই চইলে যায়।"

ভোলা সদর উপজেলার আরেক জেলে হেলাল উদ্দিন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় মাছ কম পেলে দোকানে দেনা বাড়ে। মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে নৌকা ও জ্বালানির খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, "জেলেদের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে এবার নিষেধাজ্ঞার সময় পেছানো উচিত।"

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি চৌধুরী গোলাম মোস্তফা নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা একটু সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জেলেরা বাঁচতে পারবেন।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বিভাগের ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জেলে ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা পাবেন। তবে মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বিভাগে নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫ জন। এর অর্থ, ৬৩ হাজার ৭৫৯ জন জেলে এই সহায়তার বাইরে থাকবেন।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ইসরাইল পণ্ডিত প্রতিটি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজির পরিবর্তে ১০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইলিশ মাছ রক্ষা পাবে কি না, তা অনিশ্চিত, তবে জেলেরা ভাগ্যবঞ্চিত হবেন এবং তাঁদের দুর্দশা আরও বাড়বে।

জেলে ও মৎস্যজীবীদের ধারণা, ইলিশের প্রজনন মৌসুম পিছিয়ে গেছে। এটি তাঁদের মাঠের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হলেও সরাসরি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতা গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

মৎস্য অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, দেশে মা ইলিশ রক্ষায় প্রথম ১১ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় ২০০৮ সালে। এরপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সময়সীমা বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালে তা ১৫ দিন এবং ২০১৬ সাল থেকে ২২ দিন করা হয়েছে। এই সময় নির্ধারণের মূল লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চসংখ্যক মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া।

ইলিশ সামুদ্রিক মাছ হলেও ডিম পাড়ার সময় এরা সমুদ্রের নোনা পানি ছেড়ে পদ্মা, মেঘনা ও অন্যান্য নদীর মিষ্টি পানিতে চলে আসে। এই সময়টাকে ইলিশের প্রজনন মৌসুম বলা হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...