জাতীয়

এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ: এক দশকে মানব বিলুপ্তির আশঙ্কা

এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ: এক দশকে মানব বিলুপ্তির আশঙ্কা
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ: এক দশকে মানব বিলুপ্তির আশঙ্কা
কৃত্রিম সুপার ইন্টেলিজেন্স (এএসআই) পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় হুমকি, আগামী এক দশকে মানব বিলুপ্তির আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম সুপার ইন্টেলিজেন্স বা এএসআই নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এটিকে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর কারণে চেরনোবিলের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। এমনকি আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে সব মানুষের বিলুপ্তির আশঙ্কাও ১০ শতাংশের বেশি বলে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্য ও আইনপ্রণেতারা মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এমন এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং একজন খ্যাতিমান কম্পিউটারবিজ্ঞানী পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে এআইয়ের তুলনা করে সতর্ক করেছেন। ওই কম্পিউটারবিজ্ঞানী ২০১৭ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের দাবিতে কাজ করে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি সংসদ সদস্যদের বলেন, এমন কিছু সক্ষমতার মুখোমুখি মানবজাতি এই প্রথম হচ্ছে না, যা শেষ পর্যন্ত সবাইকে মেরে ফেলতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষে কাজ করা একটি সংগঠন এই আলোচনার আয়োজন করে। এই সপ্তাহে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একজন লেবার পার্টির এমপি কৃত্রিম সুপার ইন্টেলিজেন্স তৈরি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে একটি বিল উত্থাপন করেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে একটি শীর্ষস্থানীয় এআই উন্নয়ন সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই ‘সব মানুষকে মেরে ফেলতে পারে’, এমন আশঙ্কা তিনি ১০ শতাংশের বেশি মনে করেন। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, এএসআই তৈরি হলে সেটি মানুষের ক্ষতি করবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। এএসআই কবে তৈরি হতে পারে তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে।

ওই সংস্থার এআই নিরাপত্তা গবেষণা দলের প্রধানেরও একই মত। এর আগে ওই সংস্থায় কাজ করা একজন গবেষক পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার সাবেক কর্মস্থল এবং আরেকটি শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে না।

ওই গবেষক বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ‘আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে’। তার দাবি, ওই সংস্থায় এআইয়ের ঝুঁকিগুলো ভালোভাবেই জানা আছে। কিন্তু কে আগে এ প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি আটকে গেছে।

একটি সুপরিচিত প্রযুক্তি সংস্থার এজিআই সেফটি টিম থেকে একজন গবেষক সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঝুঁকির মাত্রা অত্যধিক হয়ে যাওয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বর্তমানে এআইয়ের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য বিপদ ঠেকাতে কাজ করা একটি অলাভজনক সংস্থায় যোগ দিয়েছেন।

ওই গবেষক বলেছেন, মানুষের চেয়ে বেশি দক্ষ এবং বুদ্ধিমান এআই বানানোর দৌড়ে নেমে মানবসভ্যতার জন্য বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে। তিনি গত কয়েক সপ্তাহে এমন সব মডেলের কথা জানতে পেরেছেন, যারা মানুষকে ফাঁকি দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আঁতাত গড়েছে। এই মডেলগুলো বিভিন্ন সংস্থার সিস্টেম হ্যাক করেছে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের চিহ্ন মুছে ফেলেছে।

তিনি আরও বলেন, এই মডেলগুলো সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তার মতে, আগামী পাঁচ বছরে এআইয়ের দরুন ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে এবং ঝুঁকি এতটাই বেশি যে এটি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা।

একটি জনপ্রিয় চ্যাটবট তৈরি করা এআই সংস্থার প্রধান নির্বাহী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির তীব্র প্রতিযোগিতার গতি এখনই ধীর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। গত শনিবার সকালে তিনি তার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ লেখায় এই বিষয়ে জোর দেন।

ওই প্রধান নির্বাহী লিখেছেন, এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি অবশ্যই কমাতে হবে। তিনি স্বীকার করেন যে, মানুষ এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে এবং প্রযুক্তিটি সাইবার হামলা, জৈব সন্ত্রাসবাদ এবং মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টির মতো কাজে অপব্যবহার হতে পারে। তিনি সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান, যাতে এআই ‘ভুল পথ’ এবং মানবসভ্যতার জন্য ক্ষতির কারণ না হয়।

ওই প্রধান নির্বাহী আরও ভয়ংকর মন্তব্য করে বলেন, যদি খুব বেশি ধীরগতিতে এগোনো হয়, তাহলেও প্রযুক্তিটি ভুল মানুষের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এটিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রে একজন সিনেটর এআই নিরাপত্তা নিয়ে তার প্রচারণা আরও জোরদার করেছেন। তিনি এআই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য আবারও কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সমর্থনে একটি জনমত জরিপের ফল তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় ৮১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন এআই নিয়ে রাজনীতিবিদদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

মানুষ একসময় পারমাণবিক যুদ্ধকেই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য বড় হুমকি মনে করত। এখন অনেকেরই মনে হচ্ছে, সুপার ইন্টেলিজেন্ট এআই একই মাত্রার, এমনকি সম্ভবত আরও বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।

তবে সবাই এই বিষয়ে এতটা আতঙ্কিত নন। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বলেছেন, বাস্তবে বর্তমান এআই ব্যবস্থা মানুষের মতো বহুমুখী সক্ষমতার ধারেকাছেও নেই। এমনকি একসঙ্গে কাজ করা একদল মানুষের সক্ষমতার সঙ্গেও তাদের তুলনা চলে না।

তার ধারণা, মানবজাতি হয়তো এমন একটি সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যাকে তিনি "বড় হতাশা" বলতে চান। অর্থাৎ উন্নত এআই শেষ পর্যন্ত এত ব্যয়বহুল ও কম উপকারী হয়ে উঠতে পারে যে বর্তমান গতিতে এর উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনই থাকবে না।

একটি রাষ্ট্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত এআই গবেষণাগারের পরিচালকও অতিরিক্ত আতঙ্ক ছড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, এআই চলে যাবে না, এটি অত্যন্ত উপকারী প্রযুক্তি। তবে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন কম্পিউটার ব্যবস্থায় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এআইকে প্রবেশাধিকার দেওয়া সমস্যার কারণ হতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...