জাতীয়

ইহুদি নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়ার হিড়িক, উদ্বেগ তেল আবিবে

ইহুদি নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়ার হিড়িক, উদ্বেগ তেল আবিবে
ইহুদি নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়ার হিড়িক, উদ্বেগ তেল আবিবে
ইসরায়েল থেকে ইহুদি নাগরিকদের ব্যাপক হারে প্রস্থান ঘটছে, যা তেল আবিবের গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইহুদি নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়ার প্রবণতা এখন একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা। দলে দলে তাদের ইসরায়েল ত্যাগ করার বিষয়টি আর গোপন থাকছে না। তেল আবিবের গণমাধ্যমগুলোই এখন এই নজিরবিহীন পলায়নের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলি কর্তাব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগে পড়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধিকৃত ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বার্তা সংস্থা ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ টিভির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই বৃদ্ধি জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি কতটা গুরুতর, তা তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে।

গবেষকরা ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত টানা তিন মাসের জন্য অধিকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে চলে গেছেন মোট ২,৬৮,৯৩০ জন ইহুদি। এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা, যা দেশের জনসংখ্যাগত স্থিতিশীলতার উপর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নির্দিষ্টভাবে, ২০২৩ সালে ৮৬,৫০০ জন ইহুদি ইসরায়েল ত্যাগ করেন। এর পরের বছর, ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১,৫০০ জনে। এবং ২০২৫ সালে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৯০,৯০০ অতিক্রম করে।

গত এক দশকে ইসরায়েল থেকে ইহুদিদের বার্ষিক প্রস্থান সংখ্যা যেখানে গড়ে প্রায় ৬০ হাজার ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হঠাৎ বৃদ্ধিকে সত্যিই বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ইসরায়েলি সমাজের মূল ভিত্তি ভেঙে পড়তে পারে।

যারা ইসরায়েল ত্যাগ করছেন, তাদের বড় অংশই সমাজের অত্যন্ত দক্ষ ও উচ্চ আয়ের পেশাদার ব্যক্তি। এই দলে রয়েছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিকে 'মেধা পাচার' বা 'হিউম্যান ক্যাপিটালের ক্ষয়' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।

এই মেধা পাচারের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য খাত, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর। দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় দক্ষ জনবলের অভাব দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা এই গণপ্রস্থানের কারণ হিসেবে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নীতিকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, এসব নীতি দেশের মানুষকে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ করেছে এবং তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। এই ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়।

চ্যানেল ১২-এর একজন বিশ্লেষক এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, "নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও পাপ হলো, তিনি মানুষদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছেন।" এই বক্তব্য বর্তমান সরকারের প্রতি জন অসন্তোষের একটি চিত্র তুলে ধরে।

টাউব সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইসরায়েলে যত মানুষ এসেছেন, তার চেয়ে ২৬ হাজার বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এই পরিসংখ্যানকে 'নেতিবাচক অভিবাসন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দেশের অভিবাসন চিত্রে একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন।

আর ২০২৫ সালে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ৩৭ হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক নেতিবাচক অভিবাসনের ফলস্বরূপ, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি দেশের জনমিতি এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...