জাতীয়

হেলমেটের মান নিয়ে উদ্বেগ, আমদানি করা হেলমেটের প্রায় ২৫ শতাংশই অকৃতকার্য

হেলমেটের মান নিয়ে উদ্বেগ, আমদানি করা হেলমেটের প্রায় ২৫ শতাংশই অকৃতকার্য
হেলমেটের মান নিয়ে উদ্বেগ, আমদানি করা হেলমেটের প্রায় ২৫ শতাংশই অকৃতকার্য
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় আমদানি করা হেলমেটের প্রায় ২৫ শতাংশ মানহীন প্রমাণিত হয়েছে। বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ হেলমেটই নিম্নমানের, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক পরীক্ষায় আমদানি করা হেলমেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানসম্পন্ন নয় বলে উঠে এসেছে। গত ছয় মাসে সংস্থাটি ৪৯টি হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, যার মধ্যে ১২টি গুণগত মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে। শতাংশের হিসাবে এটি প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ।

রাজধানীর বিভিন্ন হেলমেটের দোকানে ঘুরে দেখা যায়, বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ হেলমেটই মানহীন। কিছু হেলমেট ১৫০ টাকাতেও পাওয়া যায়, যা মূলত প্লাস্টিকের আবরণযুক্ত টুপি। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব হেলমেট ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়।

রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বাইক চালান আরিফুজ্জামান শাওন। তিনি বলেন, হেলমেট না থাকলে পুলিশ মামলা দেয়, সে জন্য তারা হেলমেট দেন। অনেক যাত্রীই পরতে চান না; তাই মামলা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই হালকা হেলমেট ব্যবহার করা হয়।

রাজধানীর বাংলামোটরের জনতা অটোসের বিক্রয়কর্মী জানান, তাদের দোকানের অধিকাংশ হেলমেট ভারত থেকে আমদানি করা। বাকিগুলো স্থানীয় কোম্পানির হেলমেট। আমদানি করা হেলমেট ২৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় পাওয়া যায়, আর দেশীয় হেলমেটগুলো ৫০০ থেকে ২৫০০ টাকায় মেলে।

বাংলাদেশে আমদানি করা হেলমেটের মধ্যে বাজারে ভারতীয় হেলমেটই বেশি দেখা যায়। এছাড়া চীন, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু হেলমেটও রয়েছে, যা দাম ও মানভেদে সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৭২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এসব হেলমেট বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।

বাজারের অনেক আমদানি করা হেলমেটের গায়ে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সিল দেখা যায়। তবে বাংলামোটরের একজন হেলমেট বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকে হেলমেট কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করেন। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তাদের বিক্রি করতে হয় এবং মান দেখা তাদের কাজ নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মানহীন হেলমেট বিক্রির বিষয়ে এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, মানুষ কেনে সে জন্য তারা আনেন, কারণ তাদের ব্যবসা করতে হয়। ভালকান নামের একটি হেলমেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জানায়, তাদের সব হেলমেটই বিএসটিআই থেকে অনুমোদিত। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের শর্তাবলি অনুসরণ করে বলেও দাবি করে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মানসম্মত হেলমেট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৮ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমায়। এ জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিতে সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা জরুরি। পুলিশ চাইলেই মানহীন হেলমেট যাচাই-বাছাই করে জরিমানা করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, মানহীন হেলমেটের ব্যবহার থামাতে সরকার সড়কে প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারে। গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজারে দেখা গেছে, সড়কে মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রীদের প্রায় সবাই হেলমেট পরেছেন, তবে এসব হেলমেটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বর্তমানে ৩৩৫ ধরনের পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এই তালিকায় দুই ধরনের হেলমেট রয়েছে—মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত নিরাপত্তা হেলমেট। এই দুই শ্রেণির হেলমেট বাজারজাত করতে হলে সংস্থাটির নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মডেল ও মানের হেলমেট আমদানি করতে হলে বিএসটিআইয়ের ল্যাবে একটি নমুনা পরীক্ষা করে নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিএসটিআইয়ের হেলমেট পরীক্ষা করার ল্যাবে কয়েক ধাপে নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়। সেক্ষেত্রে একটি চালানের একটি হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা করলেই হয়।

নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিএসটিআই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে হেলমেট বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন হেলমেটে বসিয়ে তা বাজারে ছাড়তে হয়। তবে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলমেটে মানচিহ্ন থাকে না।

বিএসটিআই জানায়, পরীক্ষাগারে কৃত্রিম উপায়ে হেলমেটে আঘাত লাগলে সেটি কতটা আঘাত শোষণ করতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়। ধারালো বা শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করলে সেটি হেলমেট ভেদ করে মাথায় পৌঁছাতে পারে কিনা, তাও দেখা হয়।

এই পরীক্ষাগুলো বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থায় করা হয়, যার মধ্যে বেশি তাপমাত্রায় রেখে পরীক্ষা, কম তাপমাত্রায় রেখে পরীক্ষা, সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মির প্রভাবে রেখে পরীক্ষা এবং বৃষ্টি বা পানির সংস্পর্শে রাখার পর পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত। বিএসটিআই সাধারণত হেলমেটের ওজন, আকার, ধরন, রং, ঘর্ষণ, চাপ, তাপ, পানি সহনশীলতা, সামনের স্বচ্ছ অংশে (ভিজর) আলো আসা-যাওয়াসহ আরও কিছু বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করে।

এর মধ্যে ১৫০০ গ্রাম বা দেড় কেজিকে আদর্শ ওজন মান ধরা হয়। নিখুঁত পরীক্ষার অংশ হিসেবে হেলমেট মাথায় আটকানোর সক্ষমতাও (চিন স্ট্র্যাপ) দেখা হয়। সব ধাপে উত্তীর্ণ হলেই বিএসটিআইয়ের সনদ মেলে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...