খেলাধুলা

এজবাস্টন টেস্টে রাজাউল্লাহর চমক, পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন আশার আলো

এজবাস্টন টেস্টে রাজাউল্লাহর চমক, পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন আশার আলো
এজবাস্টন টেস্টে রাজাউল্লাহর চমক, পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন আশার আলো
২১ বছর বয়সী ক্রিকেটার রাজাউল্লাহ মাসওয়ানি সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্টে তার বোলিং ও ব্যাটিং পারফরম্যান্স দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন, যা পাকিস্তানের কঠিন সময়ে নতুন উদ্দীপনা এনেছে।

ক্রিকেটের মাঠে কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এজবাস্টন টেস্টে রাজাউল্লাহ মাসওয়ানি বোলিং হাতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের দর্শক ও নিরপেক্ষ ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে এমন কোনো প্রশান্তি ছিল না। বরং সিরিজের প্রথম দুটি টেস্টে পাকিস্তানের নিঃশর্ত হার, সাতজন খেলোয়াড়কে দেশে ফেরত পাঠানো এবং তদন্তের হুমকির মতো ঘটনাগুলো দলের জন্য এক ভারসাম্যহীন ও হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

কিন্তু ২১ বছর বয়সী এই তরুণ বোলার যখন বল হাতে নেন, তখন এক ভিন্ন সুর পরিলক্ষিত হয়। তার বোলিং যেন এক নতুন খুশবু ছড়িয়ে দেয়, আর ব্যাটিংয়ে নামতেই গ্যালারিতে দর্শকদের চোখে এক জাদুর কাজল লাগে। মাইকেল আথারটন তার এই বিশেষ বোলিংকে 'রাজবল' নামে অভিহিত করেন। এজবাস্টনে তার এই পারফরম্যান্স দর্শকদের মন জয় করে নেয়।

রাজাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার আপার দির জেলার নেহাগ দারা শহরে। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে মারদানে চলে যান। তার রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলের মতো তার প্রতিভাও ছিল বিপুল সম্ভাবনাময়।

আট ভাই-বোনের সংসারে বাবা শুরুতে তাকে ক্রিকেট খেলতে দিতে চাইতেন না। বড় ভাইকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজাউল্লাহ গোপনে টেপ টেনিস খেলতেন। তার কব্জি ও শরীরের জোর তাকে টেপ টেনিসে বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারেনি।

মারদানের আকমল খান ক্রিকেট একাডেমির প্রধান ও পাকিস্তানের সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার আকমল খানের চোখে পড়েন রাজাউল্লাহ। সেখানেই তিনি ক্রিকেট বলে দীক্ষা নিতে শুরু করেন। ২০২৩ সালে তিনি আন্তজেলা অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে অ্যাবোটাবাদ আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান।

আকমল খান স্মৃতিচারণা করে বলেন, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে নিজের প্রথম ম্যাচেই রাজাউল্লাহ দলের সেরা পারফরমারদের একজন ছিলেন। তার এই ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্সের কারণে মারদান জেলা দলে তার জায়গা পেতে বেশি সময় লাগেনি। যদিও হাতের চোটে তাকে কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল, তবে তার অদম্য ইচ্ছা তাকে কোনো বাধা মানতে দেয়নি।

ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজাউল্লাহর সুনাম ক্রমশ বাড়ছিল। অ্যাবোটাবাদ ৩০ জনের দলে থাকলেও ফার্স্ট ক্লাসের জার্সি তার গায়ে ওঠেনি। ঠিক তখনই নিয়তি তাকে সাহায্য করে; পেশোয়ার আঞ্চলিক দলের কোচ রাফাতুল্লাহ তাকে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে দলে নেন।

এই দলের হয়েই তিনি ২০২৫-২৬ মৌসুমে কায়েদে-ই-আজম ট্রফির এক ম্যাচে খেলেন। ঠিক তার আগের ম্যাচে পেশোয়ার অল্প রানে অলআউট হওয়ার পথে রাজাউল্লাহ দশ নম্বরে নেমে দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেছিলেন। পরের ম্যাচেই তাকে ওপেনার হিসেবে সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে তিনি একটি সেঞ্চুরি এবং একটি ফিফটি হাঁকান। এজবাস্টনে তৃতীয় দিনে তিনি ৯টি ছক্কা মেরে যৌথ বিশ্ব রেকর্ড গড়েন, যা তার ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রমাণ।

গত মৌসুমে পিএসএলে রাওয়ালপিন্ডিজের হয়ে তিনি সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি। তবে ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমিতে (এনসিএ) অনুশীলনের সময় তার গতি হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) পরিচালক আকিব জাভেদের নজর কাড়ে। গত আগস্টে এনসিএতে পিসিবি আয়োজিত ১২ জনের বোলিং ক্যাম্পের ‘প্লেয়ার অব দ্য ক্যাম্প’ নির্বাচিত হন রাজাউল্লাহ। এই অর্জন তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

সেই সময়ে ইংল্যান্ডে পাকিস্তান দলের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। দলে ১৪০ কিমি গতিতে বোলিং করার মতো কোনো পেসার ছিল না। এই দুর্বলতা ঢাকতে সিরিজের আগে পাকিস্তানের তৎকালীন কোচ সরফরাজ খান তার দেশে গতিময় পেসারের অভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

প্রথম দুটি টেস্টে হারের পর পাকিস্তান যে সাতজন খেলোয়াড়কে দলে ডেকেছিল, রাজাউল্লাহ তাদেরই একজন। মাত্র আটটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এজবাস্টনে খেলতে নামেন। এনসিএ থেকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে গিয়েছিলেন রাজাউল্লাহ। পাকিস্তান দল তখন ইংল্যান্ডে হাস্যরস ও তির্যক কটূক্তিতে জর্জরিত ছিল। সরফরাজের স্থলাভিষিক্ত কোচ মাইক হেসন সম্ভবত রাজাউল্লাহকে ডেকে পাঠান।

টেস্ট অভিষেকে রাজাউল্লাহর প্রথম বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৯ মাইল বা ১৪৩ কিমি। এটি ছিল সেই সিরিজে পাকিস্তানি কোনো পেসারের দ্রুততম ডেলিভারি। তার এই পারফরম্যান্স দলের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...