সারাদেশগণআন্দোলনে ছাত্র-জনতার ‘ডু অর ডাই’ সিদ্ধান্ত
২ আগস্ট ২০২৪, শুক্রবার, জামায়াত শিবির প্রকাশ্যে রাজপথে নেমে আসে এবং ছাত্র-জনতা 'ডু অর ডাই' সিদ্ধান্তে চলে যায়। মোবাইল নেটওয়ার্কে মেটার প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করা হয় এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়।
২ আগস্ট ২০২৪, শুক্রবার সরকার জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করে আরও আগ্রাসী অবস্থান নেয়। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এদিন দুপুর সোয়া ১২টার পর মোবাইল নেটওয়ার্কে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্যাশ বন্ধ করা হয়। গ্রাহকরা মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারেননি।
মেটার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম মোবাইল নেটওয়ার্কে বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোবাইল নেটওয়ার্কে টেলিগ্রাম অ্যাপও বন্ধ করা হয়। এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা শুরু হলে গত ১৭ জুলাই থেকে এসব প্ল্যাটফর্ম বন্ধ ছিল, যা ৩১ জুলাই বেলা ২টার পর চালু করা হয়েছিল।
দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটির বেশি। মোবাইল ডেটা বন্ধ থাকায় ভিপিএনের ব্যবহার বেড়ে যায়, যা ইন্টারনেটের গতির ওপর প্রভাব ফেলে। আগের দিন বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশে ইন্টারনেটে গতি স্বাভাবিক হচ্ছিল।
১ আগস্ট জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তারা প্রকাশ্যে রাজপথে নেমে আসে। এতোদিন তারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পেছন থেকে সহযোগিতা করে আসছিল। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে আসে যে তারা ‘ডু অর ডাই’ সিদ্ধান্তে চলে যায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, "আন্দোলনের এক পর্যায়ে আমরা এমন সিদ্ধান্ত নিই যে, হয় আমরা বেঁচে থাকবো, না হয় মরে যাবো। বেঁচে থাকলে আমরা এই সরকারকে উৎখাত করবো, আর নইলে আমাদের মৃত্যু হবে। আমরা এই 'ডু অর ডাই' পরিস্থিতির মধ্যে চলে গিয়েছিলাম।"
নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, গত ৫ জুন আদালতের রায় কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ২০১৮ সালে সকল কোটা বাতিল করা হলেও ২০২৪ সালে একটি একতরফা নির্বাচনের পর কোটা পুনর্বহাল করায় এই ক্ষোভ দেখা দেয়। দেশের অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থাও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করে।
তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকভাবে ৫ জুন থেকে তিন দিন আন্দোলন করে। ঈদের বন্ধের সময় আন্দোলনের পরিকল্পনা ও সংগঠন তৈরি করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়।
১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রথমবারের মতো কর্মসূচি পালন করা হয়। একই ব্যানারে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালিত হয়। ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
ঐদিন এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকে ‘রাজাকারদের আন্দোলন’ আখ্যা দেওয়া হয়। এর ফলে আন্দোলনকারী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন ওঠে এবং আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক প্রধান সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্দোলন সশস্ত্র প্রতিরোধেও যেতে পারে এমন ভাবনা ছিল।
২ আগস্ট দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী আলেম সমাজ রাজপথে নেমে আসে। সাধারণ জনগোষ্ঠীও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। আন্দোলনের রাজপথ ছাত্র-জনতা আর সাধারণ মানুষের রক্তে পিচ্ছিল হতে থাকে।
এদিন রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মুখোমুখি দাঁড়ায় জনতা। এই পরিস্থিতিকে বিপ্লব আর অভ্যুত্থানের প্রসব বেদনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিক্ষোভকারীদের দমনের জন্য ক্রমবর্ধমান তীব্র ও সহিংস রাষ্ট্রীয় পীড়ন দেখে ছাত্র-জনতা সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে।
শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ডাকা ‘দ্রোহযাত্রায়’ হাজার হাজার মানুষ যোগ দেন। যাত্রাটি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর ও টিএসসি হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বেলা তিনটার আগে থেকেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানুষেরা উপস্থিত হতে থাকেন।
যাত্রায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ যাত্রার শুরুতে বক্তব্য দেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, তাদের এখন একটাই দাবি, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে আনতে হবে। তিনি ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের’ বিচার দাবি করেন এবং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দ্রোহযাত্রাটি শুরু হয়ে বিকেল সোয়া চারটার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছায়। জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সি আর আবরার, আসিফ নজরুল এবং উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা এই যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিল্পী সমাজের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদেও সর্বস্তরের মানুষ শামিল হন।
২ আগস্ট শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দোয়া মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জাসহ সব প্রার্থনালয়ে প্রার্থনা করা হয়। নিহতদের কবর জিয়ারত ও ছাত্র-জনতার গণমিছিলের কর্মসূচিও সারাদেশে পালিত হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও হুংকার দিয়ে মাঠে নামে। জামায়াত শিবির এতোদিন পেছন থেকে আন্দোলনের কল কাঠি নাড়লেও এদিন পাদপ্রদীপের সামনে এসে পড়ে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এতে অংশ নেয়।
২ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা হত্যার প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। বিচারের দাবিতে হাজার হাজার মানুষ মিছিলে যোগ দেয়। রাজধানীসহ সারাদেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার ঘটনা ঘটে।
মতামত (0)