জাতীয়

হাওরের জীবনে ঋতুভেদে আমূল পরিবর্তন

হাওরের জীবনে ঋতুভেদে আমূল পরিবর্তন
হাওরের জীবনে ঋতুভেদে আমূল পরিবর্তন
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জীবনযাত্রায় আসে আমূল পরিবর্তন। জলের সঙ্গে বসবাস থেকে মাটির কৃষিক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটে, তবে কৃষিও আগাম বন্যা ও ঢলের ঝুঁকিতে থাকে।

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ঋতুভেদে হাওরের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়, যা সেখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলে। বর্ষায় জলের সঙ্গে তাদের বসবাস, আর শুষ্ক মৌসুমে মাটির সঙ্গে এক ভিন্ন জীবন।

বর্ষা এলেই হাওরের চেহারা বদলে যায়। নিচু জমি ধীরে ধীরে পানিতে ভরে ওঠে, একসময় চারপাশের মাঠ, রাস্তা ও বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। তখন হাওরকে এক বিশাল সমুদ্রের মতো দেখায়, যেখানে দূর থেকে গ্রামের বাড়িগুলোকে ছোট ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। এই সময় নৌকাই হয়ে ওঠে হাওরবাসীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন এবং চলাচল কল্পনাই করা যায় না নৌকা ছাড়া।

বাজারে যাওয়া, স্কুলে যাওয়া বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া—সবকিছুর জন্যই অনেক মানুষকে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষাকালে মাছ ধরা অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, যা তাদের সংসার চালানোর প্রধান উপায়। জেলে ও সাধারণ মানুষ নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বের হন এবং মাছ বিক্রি করে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। হাওরাঞ্চলের মানুষের একটি বড় অংশ কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

তবে বর্ষার জীবন সব সময় সহজ হয় না। প্রচণ্ড বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও বড় ঢেউ অনেক সময় মানুষের জন্য বিপদ নিয়ে আসে। কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিতে হলে নৌকায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং শিশুদের স্কুলে যাওয়াও অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কখন পানি বাড়বে বা কখন ঝড় আসবে—এসব অনিশ্চয়তা তখন তাঁদের জীবনেরই একটি অংশ হয়ে যায়।

বর্ষা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় আরেক পরিবর্তন। ধীরে ধীরে পানি কমতে থাকে এবং কয়েক মাস আগেও যেখানে নৌকা চলত, সেখানে বিস্তীর্ণ জমি দেখা দিতে শুরু করে। পানির বিশাল পৃথিবী যেন পরিণত হয় মাটির পৃথিবীতে, যেখানে নৌকার জায়গায় মানুষের চলাচল ও কৃষকের ব্যস্ততা চোখে পড়ে।

হাওরের মানুষের জীবনে শুষ্ক মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় কৃষিকাজের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে বোরো ধান হাওরাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শীতের সকাল থেকে কৃষকের ব্যস্ততা শুরু হয়, কেউ জমিতে কাজ করেন, কেউ ধানের পরিচর্যা করেন, আবার কেউ ফসল কাটার প্রস্তুতি নেন।

চারদিকে তখন আর পানির ঢেউ থাকে না; থাকে সবুজের সমারোহ। হাওরের অনেক পরিবারের বছরের বড় আশা থাকে এই ফসল ঘিরে, কারণ এটি তাদের ভবিষ্যতের আশা। ভালো ফসল হলে সংসারে স্বস্তি আসে এবং ধান বিক্রি করে পরিবারের বিভিন্ন খরচ মেটানো হয়। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান প্রধান ফসলগুলোর একটি এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ মানুষের জীবিকার বড় উৎস।

তবে এই কৃষিও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। অনেক সময় ফসল ঘরে তোলার আগেই আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢলের পানি এসে কৃষকের বছরের পরিশ্রম নষ্ট করে দিতে পারে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শনির হাওরে বাঁধ ভেঙে বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। হাওরবাসী শেষ চেষ্টা করেও তাদের কাঁচা ধান রক্ষা করতে পারেননি, বিষণ্ন মন নিয়ে কৃষকেরা কাঁচা ধান কেটে তা নৌকায় তুলে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমের হাওরের মধ্যে পার্থক্য সত্যিই অবিশ্বাস্য। বর্ষায় যেখানে নৌকা চলে, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে মানুষ হেঁটে যায় এবং ফসলের মাঠে পরিণত হয়। প্রকৃতি বদলায়, আর এর সঙ্গে বদলে যায় মানুষের কাজ ও জীবনযাত্রা, যা হাওরবাসীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই মানুষ অনেক সময় দুই মৌসুমে দুই ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...