জাতীয়

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিচ্ছে: চিফ প্রসিকিউটর

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিচ্ছে: চিফ প্রসিকিউটর
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিচ্ছে: চিফ প্রসিকিউটর
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিচ্ছে: চিফ প্রসিকিউটর

বাংলাদেশের চিফ প্রসিকিউটর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার এই গুরুতর মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে একাধিকবার প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উত্থাপিত অভিযোগ ও সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, যা সংস্থাটির নিরপেক্ষতা এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটি সুদীর্ঘ ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ছিল 'আফটার দ্য মুনসুন রেভল্যুশন: আ রোডম্যাপ টু লাস্টিং সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম ইন বাংলাদেশ'। এই বিশদ প্রতিবেদনে সংস্থাটি নির্বিচারে গ্রেপ্তার বন্ধ করা, বিতর্কিত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্তি এবং দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে স্থায়ী কাঠামোগত সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে, আটক প্রক্রিয়ায় আইনের কঠোর অনুসরণ এবং সমালোচকদের দমনের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ অন্যান্য কঠোর আইন বাতিলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা মানবাধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত জরুরি বলে তারা মনে করে।

এছাড়াও, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের 'ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২২'-এ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি তুলে ধরেছিল। ওই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং গুমের প্রমাণ নিয়ে জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলোর উত্থাপিত উদ্বেগগুলোকে সরকার ধারাবাহিকভাবে খারিজ করে আসছে বলে উল্লেখ করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে কোভিড-১৯ মহামারিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সাংবাদিক, চিকিৎসক ও অধিকারকর্মীদের মতো সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার অভিযোগও এনেছিল, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রাক্তন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চরম আকার ধারণ করা দমন-পীড়নের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে একটি যুগান্তকারী নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যেখানে নাগরিকদের জন্য অধিকার ও সম্মানজনক ভবিষ্যৎ গড়ার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকতে এবং একটি নিরপেক্ষ আইনের শাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সংস্থাটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ভবিষ্যতের যেকোনো দমন-পীড়ন প্রতিহত করতে হলে দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য, অন্যথায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কষ্টে অর্জিত অগ্রগতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পৃথকীকরণ এবং জনপ্রশাসন, পুলিশ, সামরিক ও বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর 'অপারেশন ডেভিল হান্ট' শুরু করে প্রায় দুই হাজার জনকে গ্রেপ্তার করার ঘটনা নিয়েও এইচআরডব্লিউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যাদের বেশিরভাগই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক বলে সংস্থাটি দাবি করেছে, যা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গণগ্রেপ্তার এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতার অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে হাজার হাজার বিএনপি নেতা-কর্মীকে 'মিথ্যা ও বানোয়াট' মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গ্রেপ্তার করার অভিযোগ তোলা হয়েছে, যার অনেক আসামির ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত অথবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এসব ঘটনাকে সংস্থাটি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক হয়রানি এবং ভয় দেখানোর সামিল বলে উল্লেখ করেছে।

এছাড়াও, সংস্থাটি লেখক মুশতাক আহমেদের বিচার-পূর্ববর্তী আটকাবস্থায় কারান্তরীণ অবস্থায় মৃত্যু, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনগুলোর অপব্যবহারের মতো ঘটনাগুলোকে সরকারের সমালোচকদের দমনের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ড এবং ২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িতে সংঘটিত ব্যাপক হামলা ও হতাহতের মতো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোও তাদের প্রতিবেদনে বিশদভাবে স্থান পেয়েছে। নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধির মোকাবিলায় সরকারের আইনগত ও বিচারিক ব্যর্থতার বিষয়টিও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গভীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কিন্তু এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা জবাবদিহিতার ঘটনা নেই বললেই চলে। সংস্থাটি তদন্তকালীন সময়ে সঠিকভাবে প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং আটককৃত যেকোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত বিচারকের সামনে হাজির করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে, যাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা আরও জানিয়েছে যে, গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচারে গুলিতে মারা গেছেন, যা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে।

এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এবং জবাবদিহিতার একটি কার্যকর সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করেছে যে, যদি কর্তৃপক্ষ বিরোধীদের 'ডেভিল' বা শয়তান হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, তবে তা নিরাপত্তা বাহিনীর দীর্ঘদিনের নির্যাতনমূলক কর্মকা-কে আরও ইন্ধন জোগাতে পারে, যারা অতীতে খুব কমই তাদের কাজের জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে। মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই বিষয়ে বলেছেন যে, জনতার সহিংসতাসহ সব অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিত, তবে কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে, প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং দেশে একটি অধিকার ও সম্মানজনক ভবিষ্যত গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী মন্তব্য করেছেন যে, আওয়ামী লীগ সরকার দশকের পর দশক ধরে দমন-পীড়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণ করেছে, তবে বর্তমান কর্তৃপক্ষের উচিত অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে নিরপেক্ষ আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

ব্র্যাড অ্যাডামস, যিনি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক, ২০২২ সালের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কোভিড-১৯ মহামারিকে একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে একটি হতাশাজনক বার্তা দিয়েছে যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমালোচনার কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে প্রায়শই 'ভিত্তিহীন' বা 'পক্ষপাতদুষ্ট' আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মার্চ মাসে আসন্ন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে একটি ঐকমত্য প্রস্তাব আনার পরামর্শ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার জন্য জাতিসংঘের অব্যাহত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন নিশ্চিত করা যাবে এবং সরকারকে মূল কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিতে উৎসাহিত করা হবে। সংস্থাটি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে কারিগরি সহায়তা গ্রহণের সুপারিশও করেছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে।

এতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সুশাসনের জরুরি সংস্কারের দিকে কার্যকরভাবে মনোনিবেশ করার কথা বলা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও প্রতিবাদকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষিত মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বলপ্রয়োগের আগে অহিংস পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে। জাতিসংঘ যেমন বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সুশাসনের জরুরি সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তারের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তার সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের গণহারে মামলা দায়েরের অভিযোগের একটি তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। উভয় ক্ষেত্রেই 'অজ্ঞাতনামা আসামি' এবং 'গণগ্রেপ্তার' নিষিদ্ধে পুলিশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে,

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...