সারাদেশ

হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ, নিরাপত্তা চাইলেন ভুক্তভোগীর মা

হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ, নিরাপত্তা চাইলেন ভুক্তভোগীর মা
হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ, নিরাপত্তা চাইলেন ভুক্তভোগীর মা
হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এক হত্যা মামলার ভুক্তভোগীর মা, তবে তিনি পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা দাবি করেছেন।

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের পর আলোচিত একটি হত্যা মামলার ভুক্তভোগী মাদরাসাছাত্রীর মা শিরিন আক্তার সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এই রায়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল, কোনো আত্মহত্যা নয়। তবে একইসঙ্গে তিনি পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন।

শিরিন আক্তার সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের কাছে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, "বাড়িঘরে আগুন দিয়ে আমাদের শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।" এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।

আলোচিত এই হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং জেল আপিলের দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে দশজন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে এবং চারজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। তাদের বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগসমূহ উচ্চ আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হয়েছে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ এবং ইফতেখার হোসেন রানা। এই চারজনের সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে আদালত তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলা থেকে খালাস পাওয়া দশজন আসামি হলেন মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, আফসার উদ্দিন, মাকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল এবং কামরুন নাহার মনি। উল্লেখ্য, মূল তথ্যে দশজনের কথা বলা হলেও প্রদত্ত তালিকায় নয়জনের নাম উল্লেখ রয়েছে।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা ধরে এই রায়ের পাঠ চলে। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি কে এম রাশেদুজামান রাজা রায়ের পুরো অংশ আদালতে পড়ে শোনান।

রায় ঘোষণার সময় আদালতের এজলাসে মামলার আসামি এবং ভুক্তভোগীর স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে, গত ২০ আগস্ট এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং জেল আপিলের ওপর শুনানি সম্পূর্ণ হয়েছিল।

আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি প্রক্রিয়া রাষ্ট্রপক্ষের পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছিলেন। এই দ্বৈত বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার নিজ কক্ষে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

এই জঘন্য ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীকালে এই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয় এবং এর তদন্ত কাজ এগিয়ে চলে।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল।

নিম্ন আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য নুসরাত হত্যা মামলার রায় ও সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। এটি ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। এই চাঞ্চল্যকর মামলাটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ডেথ রেফারেন্সের পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছিল। একই সময়ে, আসামিরা পৃথকভাবে আপিল ও জেল আপিল দায়ের করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...