প্রযুক্তি

জিপিএস প্রযুক্তির নেপথ্যে কৃষ্ণাঙ্গ গণিতবিদ গ্লাডিস মেই ওয়েস্টের অবদান

জিপিএস প্রযুক্তির নেপথ্যে কৃষ্ণাঙ্গ গণিতবিদ গ্লাডিস মেই ওয়েস্টের অবদান
জিপিএস প্রযুক্তির নেপথ্যে কৃষ্ণাঙ্গ গণিতবিদ গ্লাডিস মেই ওয়েস্টের অবদান
আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেছেন কৃষ্ণাঙ্গ গণিতবিদ গ্লাডিস মেই ওয়েস্ট। বর্ণবাদের বাধা পেরিয়ে তার গবেষণা মহাকাশ বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আধুনিক জীবনে দিকনির্দেশনার জন্য গুগল ম্যাপস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। মুঠোফোন থেকে শুরু করে গাড়ির নেভিগেশন পর্যন্ত সর্বত্র এর প্রয়োগ দেখা যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের গণিতবিদ গ্লাডিস মেই ওয়েস্টের ঐতিহাসিক অবদান রয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ এই নারী গণিতবিদ বর্ণবাদের বাধা পেরিয়ে বিজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করেন।

স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রযুক্তি বিপ্লবে গ্লাডিস মেই ওয়েস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ভার্জিনিয়ার এক গ্রামীণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। সেসময় জিম ক্রোজ আইনের কারণে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ভালো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। তিনি ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ভার্জিনিয়া স্টেট কলেজ থেকে ডিগ্রি লাভ করেন।

গণিত নিয়ে পড়াশোনা করা অল্প কয়েকজন নারীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি ডাহলগ্রেনের নেভাল প্রভিং গ্রাউন্ড সেন্টারে তার কর্মজীবন শুরু করেন। সামরিক বিভাগে কর্মরত থাকায় তার গবেষণার তথ্য কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হতো।

গ্লাডিস মেই ওয়েস্ট ১৯৬২ সালে প্রজেক্ট টুয়েন্টি নাইন ভি-তে কাজ শুরু করেন। নেপচুনের সাপেক্ষে প্লুটোর কক্ষপথ হিসাব করা ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। তার দল একটি কম্পিউটারকে দিয়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন হিসাব সম্পন্ন করে। প্রায় শত ঘণ্টা কম্পিউটার চালানোর পর ১৯৬৪ সালে এই গবেষণা সফল হয়। প্লুটোর কক্ষপথের নিয়মিতকরণ প্রমাণ করে তার দল মেরিট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।

পরবর্তীকালে তিনি নেভাল প্রভিং গ্রাউন্ড সেন্টারের চাকরি ছেড়ে ডাহলগ্রেনের ডিফেন্স ম্যাপিং এজেন্সিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি সিজ্যাট রাডার অল্টিমেট্রি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। পৃথিবীর পরিবেশ এবং সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য মডেলিং করার জন্য এই সিস্টেম তৈরি করা হয়েছিল। উপগ্রহটি পৃথিবীর আকার বুঝতে অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে।

পরে গ্লাডিস মেই ওয়েস্ট জিওস্যাট নামক একটি নৌবাহিনীর উপগ্রহের ডেটা নিয়ে নতুন কাজ শুরু করেন। তিনি আইবিএম সেভেন থার্টি স্ট্রেচ সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে ডেটা বিশ্লেষণ করেন। পৃথিবীর আকৃতি পরিবর্তনকারী মহাকর্ষীয় এবং জোয়ারের শক্তিগুলোর হিসাব তিনি নিখুঁতভাবে করেন। এই সুপার কম্পিউটারটি দেখতে একটি বিশাল ঘরের মতো বড় ছিল।

ওয়েস্ট এবং তার দলের তৈরি মডেলগুলো জিপিএসের মূল ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে জিপিএসের কক্ষপথ নিখুঁত করতে এই মডেলগুলো ব্যবহার করা হয়। নেভস্টার প্রোগ্রামের অধীনে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জিপিএস সিস্টেম তৈরি করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে এই জিপিএস সিস্টেম সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা হয়।

গ্লাডিস মেই ওয়েস্ট ১৯৯৮ সালে ডাহলগ্রেন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে তিনি পড়াশোনা ও গবেষণার কাজ থামিয়ে রাখেননি। দুই হাজার সালে তিনি ভার্জিনিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তার আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে তার এই অবদান অনেকটাই আড়ালে রয়ে গিয়েছিল। ২০১৮ সালে তাকে ইউএস এয়ারফোর্স স্পেস অ্যান্ড মিসাইল পাইওনিয়ার্স হলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এই সম্মান পাওয়া তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী। ভার্জিনিয়া জেনারেল অ্যাসেম্বলির পাস করা বিলেও তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। ন্যাশনাল ব্ল্যাক কলেজ অ্যালামনাই হলের পক্ষ থেকেও তাকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...