জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ককে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের দৃষ্টিতে অবিচ্ছেদ্য বলে বিবেচনা করা হয়। এই দর্শনে জ্ঞান কখনোই নিজেকে দিয়েই পূর্ণতা লাভ করে না; জ্ঞানের স্বাভাবিক ফল হলো কর্ম। অন্যদিকে, কর্মের অন্তর্নিহিত ভিত্তি হলো জ্ঞান।
উভয়কে বিচ্ছিন্ন করা হলে মানুষের অস্তিত্বকেই খণ্ডিত করা হয়। কারণ মানুষ এমন কোনো সত্তা নয় যে শুধু জানার জন্য জানে, আবার না জেনেও যথার্থভাবে কাজ করতে পারে না। মানুষের জ্ঞান কর্মের মধ্যে পরিপূর্ণতা লাভ করে, আর কর্ম জ্ঞানের মধ্যে হেদায়েত অর্জন করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কই ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি।
আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের একটি বড় প্রবণতা হলো জ্ঞানকে নিরপেক্ষ বলে কল্পনা করা। যেন জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের নৈতিক দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি তত্ত্ব সত্য কি না, সেটিকেই একমাত্র প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। সেই তত্ত্ব মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, সমাজে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করে বা প্রকৃতির প্রতি কী আচরণ জন্ম দেয়—এসব জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় বলে মনে করা হয় না।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র এই বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করে। কোনো জ্ঞান যদি মানুষের জীবনে, চরিত্রে এবং সভ্যতায় কোনো ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে না পারে, তবে সেই জ্ঞান তার পূর্ণ উদ্দেশ্যে পৌঁছায়নি বলে মনে করা হয়। এই দর্শনে ইলম একটি আমানত বা দায়িত্ব। আমানতের বৈশিষ্ট্য হলো তাকে ধারণ করলেই দায়িত্ব জন্ম নেয়।
অতএব, মানুষ যখন কোনো সত্য জানতে পারে, তখন সে কেবল নতুন একটি তথ্য অর্জন করে না, বরং একটি নতুন দায়িত্বও গ্রহণ করে। যে কৃষক জানেন মাটি কীভাবে উর্বর থাকে, তার ওপর সেই জ্ঞান অনুযায়ী মাটির হেফাজতের দায়িত্ব বর্তায়। যে শাসক ন্যায়ের নীতি জানেন, তার ওপর ইনসাফ কায়েমের দায়িত্ব থাকে।
যে আলেম সত্য জানেন, তার ওপর সেই সত্যের সাক্ষ্য বহনের দায়িত্ব বর্তায়। ফলে জ্ঞান কখনো কেবল অধিকার নয়, জ্ঞান সর্বদা দায়িত্বের সূচনা করে।
আমল আবার জ্ঞানকে পরিশুদ্ধও করে। মানুষ যখন সত্য অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করে, তখন এমন অনেক বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হয়, যা কেবল তাত্ত্বিক চিন্তায় ধরা পড়ে না। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা জ্ঞানকে স্থবির অবস্থা হিসেবে দেখে না, বরং একটি চলমান রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করে।
সত্য প্রথমে মানুষের বোধে দাখিল হয়, তারপর তার বিবেকে, এরপর তার সিদ্ধান্তে এবং সর্বশেষে তার আচরণে। এই ধারাবাহিকতার কোনো একটি স্তর ভেঙে গেলে জ্ঞানের পূর্ণতা নষ্ট হয়। যে জ্ঞান সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করে না, তা এখনো হৃদয়ে প্রবেশ করেনি। যে সিদ্ধান্ত আচরণে প্রতিফলিত হয় না, তা এখনো চরিত্রে রূপান্তরিত হয়নি।



মতামত (0)