ধর্ম

জ্ঞান ও আমলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক: ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্ব

জ্ঞান ও আমলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক: ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্ব
জ্ঞান ও আমলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক: ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্ব
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের দৃষ্টিতে জ্ঞান ও আমল অবিচ্ছেদ্য। জ্ঞান কর্মের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় এবং কর্ম জ্ঞানের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা লাভ করে, যা মানুষের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য।

জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ককে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের দৃষ্টিতে অবিচ্ছেদ্য বলে বিবেচনা করা হয়। এই দর্শনে জ্ঞান কখনোই নিজেকে দিয়েই পূর্ণতা লাভ করে না; জ্ঞানের স্বাভাবিক ফল হলো কর্ম। অন্যদিকে, কর্মের অন্তর্নিহিত ভিত্তি হলো জ্ঞান।

উভয়কে বিচ্ছিন্ন করা হলে মানুষের অস্তিত্বকেই খণ্ডিত করা হয়। কারণ মানুষ এমন কোনো সত্তা নয় যে শুধু জানার জন্য জানে, আবার না জেনেও যথার্থভাবে কাজ করতে পারে না। মানুষের জ্ঞান কর্মের মধ্যে পরিপূর্ণতা লাভ করে, আর কর্ম জ্ঞানের মধ্যে হেদায়েত অর্জন করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কই ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি।

আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের একটি বড় প্রবণতা হলো জ্ঞানকে নিরপেক্ষ বলে কল্পনা করা। যেন জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের নৈতিক দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি তত্ত্ব সত্য কি না, সেটিকেই একমাত্র প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। সেই তত্ত্ব মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, সমাজে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করে বা প্রকৃতির প্রতি কী আচরণ জন্ম দেয়—এসব জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় বলে মনে করা হয় না।

ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র এই বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করে। কোনো জ্ঞান যদি মানুষের জীবনে, চরিত্রে এবং সভ্যতায় কোনো ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে না পারে, তবে সেই জ্ঞান তার পূর্ণ উদ্দেশ্যে পৌঁছায়নি বলে মনে করা হয়। এই দর্শনে ইলম একটি আমানত বা দায়িত্ব। আমানতের বৈশিষ্ট্য হলো তাকে ধারণ করলেই দায়িত্ব জন্ম নেয়।

অতএব, মানুষ যখন কোনো সত্য জানতে পারে, তখন সে কেবল নতুন একটি তথ্য অর্জন করে না, বরং একটি নতুন দায়িত্বও গ্রহণ করে। যে কৃষক জানেন মাটি কীভাবে উর্বর থাকে, তার ওপর সেই জ্ঞান অনুযায়ী মাটির হেফাজতের দায়িত্ব বর্তায়। যে শাসক ন্যায়ের নীতি জানেন, তার ওপর ইনসাফ কায়েমের দায়িত্ব থাকে।

যে আলেম সত্য জানেন, তার ওপর সেই সত্যের সাক্ষ্য বহনের দায়িত্ব বর্তায়। ফলে জ্ঞান কখনো কেবল অধিকার নয়, জ্ঞান সর্বদা দায়িত্বের সূচনা করে।

আমল আবার জ্ঞানকে পরিশুদ্ধও করে। মানুষ যখন সত্য অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করে, তখন এমন অনেক বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হয়, যা কেবল তাত্ত্বিক চিন্তায় ধরা পড়ে না। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা জ্ঞানকে স্থবির অবস্থা হিসেবে দেখে না, বরং একটি চলমান রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করে।

সত্য প্রথমে মানুষের বোধে দাখিল হয়, তারপর তার বিবেকে, এরপর তার সিদ্ধান্তে এবং সর্বশেষে তার আচরণে। এই ধারাবাহিকতার কোনো একটি স্তর ভেঙে গেলে জ্ঞানের পূর্ণতা নষ্ট হয়। যে জ্ঞান সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করে না, তা এখনো হৃদয়ে প্রবেশ করেনি। যে সিদ্ধান্ত আচরণে প্রতিফলিত হয় না, তা এখনো চরিত্রে রূপান্তরিত হয়নি।

অতএব, আমল জ্ঞানের বহিরাবরণ নয়, এটি তার অস্তিত্বগত ফলাফল। এখানেই ‘জানা’ ও ‘উপলব্ধি করা’র মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র। অনেক বিষয় মানুষ জানে, কিন্তু উপলব্ধি করে না। যেমন, সে জানে অপচয় অন্যায়, কিন্তু তার জীবন অপচয়ে পূর্ণ।

সে জানে জুলুম অন্যায়, কিন্তু সুবিধা পেলেই অন্যায়ের অংশ হয়ে যায়। সে জানে প্রকৃতি আমানত, কিন্তু ব্যবহার করে মালিকের মতো। এই অবস্থায় জ্ঞান স্মৃতিতে হাজির থাকে, কিন্তু অস্তিত্বে থাকে অনুপস্থিত। প্রকৃত ইলম তখনই জন্ম নেয়, যখন জানা মানুষের জীবনযাপনের রীতিতে পরিণত হয়।

ন্যায়বিচার নিয়ে শত গ্রন্থ পাঠ করা সম্ভব, কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার বাস্তব সংগ্রাম মানুষকে ন্যায়ের নতুন মাত্রা শিক্ষা দেয়। পরিবেশনীতি নিয়ে গবেষণা করা যায়, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান মানুষকে তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য অনুভব করতে শেখায়। অর্থাৎ আমল শুধু জ্ঞানের ফল নয়, এটি জ্ঞানের নতুন উৎসও বটে।

একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, একটি বন সংরক্ষণ করা, একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সংস্কারও ইলমের বাস্তবায়ন। এই কারণে ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে জ্ঞান ও কর্ম একটি চক্রাকার সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ। জ্ঞান কর্ম সৃষ্টি করে, কর্ম আবার জ্ঞানকে গভীরতর করে।

এই দর্শনে সভ্যতার সংকট মূলত জ্ঞান ও আমলের বিচ্ছেদ। মানুষ আজ পরিবেশের বিপর্যয় সম্পর্কে জানে, কিন্তু তার অর্থনীতি সেই জ্ঞানের বিপরীতে পরিচালিত হয়। মানবাধিকারের বিষয়ে জানে, কিন্তু রাজনীতি তার বিপরীত পথে চলে। নৈতিকতার পাঠ দেওয়া হয়, কিন্তু বাজার তার উল্টো সংস্কৃতি নির্মাণ করে।

ফলে সমস্যা তথ্যের নয়, জ্ঞানের সামাজিক অবতারণার। ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্র মনে করে, কোনো সভ্যতা তখনই প্রাজ্ঞ হয়, যখন তার জ্ঞান তার প্রতিষ্ঠান, আইন, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির মধ্যে জীবন্ত রূপ ধারণ করে। এ জন্য আমল শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত বা নৈতিক আচরণের নাম নয়, সমাজ নির্মাণও আমলের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে ইলম ও আমল পৃথক নয়। তারা একই জীবন্ত সত্যের দুটি অবস্থা। ইলম দিকনির্দেশনা দেয়, আমল তাকে বাস্তবে রূপ দেয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...