ধর্মআল্লাহর ভালোবাসা লাভের ৫ উপায়
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের ৫ উপায়
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের জন্য পবিত্র কোরআনে পাঁচটি মৌলিক গুণ ও আমলের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খোদাভীতি, তাওবা, পরোপকার, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও ধৈর্যধারণ।
মানবজীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করা। প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে তাঁর রবের প্রিয়পাত্র হওয়ার এবং অসীম রহমত ও সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে। পবিত্র কোরআন কেবল নির্দেশনার কিতাব নয়, এটি এমন এক আলোকবর্তিকা যেখানে আল্লাহ নিজেই তাঁর কাছে বান্দার কোন গুণ ও আচরণ সর্বাধিক প্রিয় তা বর্ণনা করেছেন।
পবিত্র কোরআনের আলোকে আল্লাহর খাঁটি ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের কিছু মৌলিক গুণ ও আমল রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সার্বক্ষণিক খোদাভীতি অর্জন করা। আল্লাহর ভালোবাসা লাভের প্রধানতম সোপান হলো অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত রাখা। তাকওয়া কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও নজরদারির অনুভূতি নিয়ে চলাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।
আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৬) তাকওয়ার প্রকৃত রূপ তখন ফুটে ওঠে যখন মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালে সম্পূর্ণ নির্জনতায় থাকে। পাপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখা এবং প্রবৃত্তির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো খাঁটি মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয় পথটি হলো তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; প্ররোচনা ও দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে মানুষের পদস্খলন ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পাপের পর যে হৃদয় উদ্ধত না হয়ে অপরাধ স্বীকার করে, অনুতপ্ত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় এবং বিনীতভাবে রবের কাছে ফিরে আসে, সেই অন্তর আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২) পাপ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়ে বহুগুণ প্রশস্ত। বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে তাওবা করে, তখন আল্লাহ–তাআলা মরুভূমিতে পথহারা উট ফিরে পাওয়ার চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৯)
তৃতীয়ত, পরোপকারে নিবেদিত হওয়া আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম প্রধান গুণ। এর আরবি পরিভাষা হলো ‘ইহসান’ বা আন্তরিক সৎকর্মশীলতা। এর অর্থ হলো প্রতিটি ভালো কাজকে সুন্দর, ত্রুটিহীন ও সর্বোত্তম রূপে সম্পন্ন করা এবং সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ সদাচরণ করা। আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দেন, ‘আর তোমরা সৎকর্ম করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
ইহসান কেবল নামাজের একাগ্রতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃস্বার্থভাবে করা একটি ছোট সৎকাজও আল্লাহর দরবারে নাজাতের অসিলা হয়ে যেতে পারে।
চতুর্থত, আল্লাহর ওপর অটল নির্ভরতা রাখা। পার্থিব জীবনে মানুষের পরিকল্পনা অনেক সময় ভেস্তে যায়, প্রিয়জনেরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং চারদিকের সমস্ত পথ রুদ্ধ বলে মনে হয়। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও হতাশ না হয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই হলো ‘তাওয়াক্কুল’। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
তাওয়াক্কুল অর্থ চেষ্টা ও কর্ম পরিত্যাগ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং সাধ্যমতো সঠিক উপকরণ ও সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করার পর চূড়ান্ত ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া। রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আগে তোমার উটটি রশি দিয়ে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)
পঞ্চমত, প্রতিকূলতায় ধৈর্যধারণ করা। মানবজীবন পরীক্ষা ও সংকটের এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষেত্র। রোগব্যাধি, আর্থিক ক্ষতি, প্রিয়জন বিয়োগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের সামনে বারবার এসে দাঁড়ায়। এই কঠিন মুহূর্তগুলোতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল থাকার নামই হলো ‘সবর’। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৬) ধৈর্যশীল বান্দা জানে—দুঃখের পরই আসে স্বস্তি এবং সাময়িক এই পরীক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনন্ত কল্যাণ।
মতামত (0)