ধর্ম

প্রকৃতির উপমায় মানব জীবনের গভীর শিক্ষা

প্রকৃতির উপমায় মানব জীবনের গভীর শিক্ষা
প্রকৃতির উপমায় মানব জীবনের গভীর শিক্ষা
কোরআন মৌমাছির জীবনব্যবস্থা, ফসলের বেড়ে ওঠা ও শুকিয়ে যাওয়া এবং খাদের কিনারার উপমার মাধ্যমে মানুষকে গভীর শিক্ষা দেয়। এতে ওহি মোতাবেক জীবনযাপন, অন্যের ক্ষতি না করা এবং চিন্তাশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

কোরআন প্রাণপ্রকৃতির উপমা দিয়ে মানুষকে আল্লাহর কুদরত চিনতে শেখায়। এটি মানুষকে নিজের জীবন এবং চারপাশের জগৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করে। পাথরের ওপর আলগা মাটি, উঁচু ভূমির বাগান, একই শ্রেণির গাছে ফলনের ভিন্নতা কিংবা বাতাসে উড়ে যাওয়া ছাইয়ের উপমার মাধ্যমে কোরআন গভীর বার্তা দিয়েছে।

মৌমাছির জীবনব্যবস্থা, ফসলের বেড়ে ওঠা ও শুকিয়ে যাওয়া এবং খাদের কিনারার উপমার মধ্য দিয়ে কোরআন মানুষকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা সুরা নাহলের ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে মৌমাছিকে পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষের তৈরি মাচানে ঘর বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মৌমাছিকে প্রত্যেক ফল থেকে আহার করে প্রতিপালকের সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এর পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়, যা মানুষের জন্য আরোগ্য বহন করে। চিন্তাশীল মানুষের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।

মৌমাছির জীবনব্যবস্থার উদাহরণে আল্লাহ তাআলা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশ করেছেন। মৌমাছি নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী চলে না; বরং আল্লাহ তাআলা তাকে যে পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন, সে সেই পথেই চলে। কোথায় বাসা বানাবে, কোথা থেকে আহার করবে এবং কীভাবে চলবে—সবকিছুতেই আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে। মানুষের জীবনও তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে নিজের প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশির পরিবর্তে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে। নিজের বুদ্ধি ও প্রবৃত্তিকে ওহির ওপর প্রাধান্য না দিয়ে আল্লাহর দেখানো ‘সহজ পথ’ অনুসরণ করাই মানুষের প্রকৃত সাফল্যের পথ।

মৌমাছি তার খাদ্যের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর উৎস বেছে নেয়, ফুল থেকে রস সংগ্রহ করে। এই রস থেকেই মধুর মতো উপকারী বস্তু তৈরি হয়, যা মানুষের জন্য আরোগ্যও বহন করে। তার কর্মের সুফল শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অন্যরাও তা থেকে উপকৃত হয়। মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে এমনভাবে ফুলের ওপর বসে, যাতে ফুলের কোনো ক্ষতি হয় না। মুসনাদে আহমদ–এর ৬৮৭২ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, মুমিনের উদাহরণ মৌমাছির মতো; সে পবিত্র জিনিস খায়, পবিত্র জিনিসই বের করে, আর সে যখন ফুলের ওপর বসে, তখন তা ভেঙে ফেলে না কিংবা নষ্টও করে না।

আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ অর্থাৎ মৌমাছিকে শুধু দেখলেই হবে না; তার জীবনব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম প্রাণীর মধ্যেও আল্লাহ তাআলা যে নিখুঁত ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও হেকমত রেখেছেন, তা নিয়ে চিন্তা করলেই সৃষ্টিকর্তার কুদরত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সুরা হজ–এর ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ফসলের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মানুষকে মাটি থেকে, তারপর বীর্য থেকে, রক্তপিণ্ড থেকে, এবং পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি মাংসপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিত রাখার পর মানুষকে শিশুরূপে বের করা হয়, যাতে তারা পরিণত বয়সে উপনীত হয়। মানুষের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু ঘটানো হয় এবং কাউকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় অকর্মণ্য বয়সে, যার ফলে সে যা কিছু জানত, সে সম্বন্ধেও সজ্ঞান থাকে না।

একই আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ ভূমিকে শুষ্ক দেখে। এরপর আল্লাহ তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও বাড়বাড়ন্ত হয়ে ওঠে এবং তা সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। এই উপমা পুনরুত্থান সম্বন্ধে মানুষের সন্দেহ দূর করতে সাহায্য করে। আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা, ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর সেগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে সেগুলো পীতবর্ণ দেখা যায়, অবশেষে সেগুলো খড়কুটায় পরিণত হয়। আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। দুনিয়ার জীবন প্রতারণা সামগ্রী ছাড়া কিছু নয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...