জাতীয়

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের গতিপথ: বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের গতিপথ: বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের গতিপথ: বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত সপ্তম মাসে গড়িয়েছে, দ্রুত চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। নতুন মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ ও হামলার মুখে তেহরান নতি স্বীকার করবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানে দ্রুত কোনো চুক্তির সম্ভাবনা আবারও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বিবদমান উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলছে না। সংঘাতটি এখন সপ্তম মাসে গড়িয়েছে।

কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের নতুন ধাপে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর আওতায় তারা ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। এই ঘোষণার পরপরই নতুন করে হামলা শুরু হয়।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ করাও ছিল তাদের উদ্দেশ্য। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সংঘাত শুরু করে।

এরপর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক নৌপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। গত জুনে দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে সেই সময়সীমা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য ঠিক কী, তা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায় না। হোয়াইট হাউস রাজনৈতিক ছাড়ের সীমা বারবার পর্যালোচনা করছে। শুরুতে সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত জয়ের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সেই ফল আসেনি।

এখন ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রভাব কাজে লাগিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে পরিস্থিতি একরকম স্থবির রাখতেই আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তারা অর্থনৈতিক অবরোধ বহাল রাখছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ইরানি সক্ষমতাগুলোতে মাঝেমধ্যে আক্রমণ চালাচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং একপর্যায়ে নতি স্বীকার করে দুর্বল অবস্থানে থেকে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। এর উদ্দেশ্য, বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধাক্কা এড়ানো এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো।

জেসন ক্যাম্পবেলের ধারণা, সংকট সমাধানের বিনিময়ে ইরান বড় ধরনের সুবিধা দাবি করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে তেহরানের আজাদি স্কয়ারে একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত ব্যানার দেখা যায়।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার ফলে যুদ্ধের ব্যাপারে ইরানের মূল কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। তেহরান তাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক মাসের মতো বিচ্ছিন্ন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতিও তাদের আছে।

বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে প্রতিটি হামলার আনুপাতিক জবাব দেওয়াটা হবে ইরানের কৌশল। অর্থনৈতিক দিক থেকে এসব নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টত দেশটির অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যুদ্ধের কারণে তাদের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সিরিকের কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের কাছে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির চারপাশে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি আরও বলেন, দেশটিতে কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে, যা গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বিক্ষোভের সময়ে দেখা গেছে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ইরান শিগগিরই তাদের অবস্থান বদলাবে কিংবা আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত ইরানের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে না। ইরান সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে না এমন নয়।

তার মতে, ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগের সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) ফিরে যাক অথবা কোনো ধরনের ছাড় দিক। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। নতুন নিষেধাজ্ঞা বা আরও বেশি হামলার মুখেও তারা নিজেদের নীতি বদলাবে না।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন বলেন, সাম্প্রতিক ইরানে হামলা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এভাবে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। এটি আসলে চলমান সংকটের আরেকটি নতুন অধ্যায়মাত্র।

অর্থনৈতিক চাপ কাজ করবে বলে মনে হয় না। কারণ, চীন, রাশিয়াসহ যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করবে না। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা অব্যাহত রাখতে পারে।

নিকোলাস হপটন বলেন, এই সংঘাত থেকে বের হতে হোয়াইট হাউসের কৌশল কী হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র পথটি ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছে। ট্রাম্প যদি গত জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিতেন, তবে সেটাই হতো সংঘাত থেকে বের হওয়ার মোক্ষম উপায়। এই চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের একরকম বিজয় অর্জিত হতো।

একই সঙ্গে ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থীরা দুর্বল হতো। পাশাপাশি ইরান যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তাও মিলত। ওই সমঝোতা স্মারকে একটি বড় ধরনের সমাধান ছিল, সেটি হলো ইরানের ওপর থেকে সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ধীরে ধীরে ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষমতা কমে যেত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে দেশটিতে ধীরে ধীরে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আসত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...