চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তার স্ত্রী ও ফার্স্টলেডি পেং লি ইউয়ানকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে তারা এই সফরে এসেছেন।
স্থানীয় সময় বিকেলে ওয়াশিংটনের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডিকে বহনকারী উড়োজাহাজটি অবতরণ করে। বিমানঘাঁটিতে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার স্ত্রী ও ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
মার্কিন শিশুরা এ সময় শি জিনপিং ও পেং লি ইউয়ানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। দুই পাশে লাল গালিচার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সামরিক ব্যান্ড চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে।
সেই সঙ্গে ২১ বার তোপধ্বনি এবং যুদ্ধবিমান উড়িয়ে অভিবাদনও জানানো হয়। জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ১১ বছরের মধ্যে এই প্রথম একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একজন বিদেশি নেতাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানালেন। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট জিনপিং ও ফার্স্টলেডি পেং লি ইউয়ানকে স্বাগত জানাতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি এই সফরকে সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা একটি সফর বলে উল্লেখ করেন।
তিনি প্রেসিডেন্ট জিনপিংকে একজন মহান নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তার পদার্পণের মুহূর্তটিও মহান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে ফলপ্রসূ মতবিনিময় এবং দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করেন।
জবাবে এক লিখিত বক্তব্যে চীনা জনগণের পক্ষ থেকে মার্কিন জনগণের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান শি জিনপিং। তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই মহান দেশ এবং দুই দেশের জনগণই মহান।
তিনি আরও বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে এবং দুই দেশের স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। দুই দেশের অংশীদার হওয়া উচিত, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’—এই দুই লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এগুলো পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে, একে অপরকে এগিয়ে নিতে পারে এবং বিশ্বকে উপকৃত করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট জিনপিং স্মরণ করেন, চলতি বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের সময় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে তারা একমত হয়েছিলেন। এটি ভবিষ্যতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং এমন একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে সহযোগিতা হবে প্রধান ভিত্তি। এখানে প্রতিযোগিতা থাকবে সংযত, মতপার্থক্য থাকবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং শান্তির সম্ভাবনা থাকবে সুস্পষ্ট।
এভাবেই নতুন যুগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বৃহৎ দেশের সঠিকভাবে সহাবস্থানের পথ তৈরি করা সম্ভব। চীনের প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব এগিয়ে চললেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহাসিক যুক্তি বদলায়নি।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক প্রত্যাশাও বদলায়নি। তিনি দুই দেশের সম্পর্ক এবং বিশ্বের পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে গভীরভাবে মতবিনিময় করার প্রত্যাশা করেন।
একই সঙ্গে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের বিষয়বস্তু আরও সমৃদ্ধ করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা করেন প্রেসিডেন্ট জিনপিং।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলের মানুষের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ করা এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী বলে জানান। দুই পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সফর অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে এবং এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের কল্যাণ বৃদ্ধি পাবে ও বিশ্ব শান্তিতে নতুন আশার সঞ্চার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই সফর দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্পর্কের পরীক্ষা নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরান নিয়ে চাপা উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই শি জিনপিংয়ের এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
যদিও এই সফরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আশা কম, তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিং তাদের ১১ মাসের বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এ সময়সীমা বাড়াতে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন।
এই যুদ্ধবিরতি পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ধারা স্থগিত রেখেছিল, যার মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হবে। বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও কম্পিউটার চিপের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ইরানের সঙ্গে চীনের মিত্রতা এবং তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের মতো বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
মতামত (0)