ফয়সাল ফরিদ চৌধুরী কাতার থেকে মক্কা ও মদিনা হয়ে কাতারে ফিরে আসার প্রায় দশ দিনের সড়কযাত্রার স্মৃতিচারণা করেছেন। এই যাত্রায় তিনি বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পবিত্র স্থানগুলো পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
কাতার থেকে মক্কা ও মদিনা হয়ে পুনরায় কাতারে ফেরার প্রায় দশ দিনের সড়কযাত্রার স্মৃতিচারণা করেছেন ফয়সাল ফরিদ চৌধুরী। এই ভ্রমণকে তিনি শুধু একটি স্থানের থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরেও অনেকটা পথ হাঁটার অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কাতার থেকে পবিত্র মক্কা, মক্কা থেকে পবিত্র মদিনা, তারপর আবার কাতার—এই পুরো সড়কযাত্রা তার কাছে এক বিশেষ সফর ছিল।
যাত্রা শুরু হয়েছিল কাতারের মদিনাত খলিফা থেকে। বাসে মিসর, লেবানন, ইয়েমেন, কাতার, সোমালিয়া, কেনিয়া, ক্যামেরুন, রুয়ান্ডা, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় দশটি পরিবার ছিল। দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও শুরুতে অপরিচিত সবাই দীর্ঘ পথে একসঙ্গে নামাজ, খাবার ও ছোট ছোট আনন্দ-বেদনার মধ্যে এক পরিবারের মতো হয়ে ওঠে।
কাতারের আবু সামরা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের সালওয়াতে প্রবেশ করে। সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় দীর্ঘ মরুপথ। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর প্রথম বড় বিরতি নেওয়া হয়, যেখানে সবাই মাগরিবের নামাজ আদায় করে এবং খাবার গ্রহণ করে।
আল-আহসা ও আল-হুফুফের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ছোট শহর, পেট্রলপাম্প ও দূরের আলো দেখা যায়। আল-খালিদিয়াহ এলাকায় কিছুক্ষণ থামা হয়েছিল, যেখানে যাত্রীরা পানি পান, বিশ্রাম বা বাড়িতে ফোন করে। এই ছোট ছোট বিরতিগুলো দীর্ঘ যাত্রাকে মানবিক গল্পে পরিণত করে।
এরপর রিয়াদে পৌঁছানো হয়। দিনভর মরুভূমির একঘেয়ে বিস্তারের পর রাতের রিয়াদকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী মনে হয়। ঝলমলে আলো, উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক ও গাড়ির সারি সবার নজর কাড়ে। রিয়াদের আলো পেছনে ফেলে আবার মরুভূমির দীর্ঘ রাত শুরু হয়।
আল-তারাফে ফজরের নামাজের জন্য বাস থামানো হয়। অজু, নামাজ, বিশ্রাম ও চা পানের পর আবার যাত্রা শুরু হয়। আল-মুওয়াইহে সকালের খাবারের বিরতি নেওয়া হয়। দীর্ঘ পথের যাত্রীদের কাছে নামাজের জায়গা, পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, পেট্রলপাম্প ও ভালো খাবারের মতো ছোট সুবিধাগুলোও আনন্দের উৎস ছিল।
মরুভূমির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাইফের দিকে আসার সময় দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়। পাহাড়ি পথ, উপত্যকা ও অপেক্ষাকৃত শীতল আবহাওয়া তাইফকে মরুর বিস্তারের মধ্যে এক স্বস্তির শহর হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে তাইফে থেমে থাকা তাদের গন্তব্য ছিল না, সামনে মক্কা ছিল।
ইহরামের সাদা কাপড় পরার পর মনে হয়, তারা এতক্ষণ শুধু পথের যাত্রী ছিল; এখন আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এগিয়ে চলেছে। "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক" ধ্বনি একজনের কণ্ঠ থেকে আরেকজনের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসে। কারনুল মানাজিল থেকে মক্কা পৌঁছানো পর্যন্ত তালবিয়া একবারও থামেনি।
মক্কায় পৌঁছে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এতক্ষণের পথ আসলে এই মুহূর্তটির কাছেই এসে থেমেছে। মক্কার দিনগুলো নামাজ, তাওয়াফ ও দোয়ার মধ্যে কাটে। বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসার অনুভূতি হয়।
মদিনায় যাওয়ার আগের রাতে শেষ তাওয়াফের মুহূর্ত আসে। সেদিন তাওয়াফের অনুভূতি ভিন্ন ছিল, কাবা দেখার আনন্দের সঙ্গে বিদায়ের কষ্ট মিশে যায়। প্রতিটি চক্করের সঙ্গে মনে হচ্ছিল, সময় ফুরিয়ে আসছে। শেষবারের মতো কাবা শরিফের দিকে তাকিয়ে চোখ সরাতে ইচ্ছে করছিল না।
ফজরের নামাজ শেষে মক্কা ত্যাগ করা হয়। কাবা শরিফকে পেছনে রেখে বাস যখন মদিনার পথে চলে, তখন মনে হয় একটি পবিত্র অধ্যায় শেষ হলো এবং সামনে আরেকটি ভালোবাসার শহর অপেক্ষা করছে। মক্কা থেকে মদিনার পথে নামাজ ও খাবারের বিরতি ছিল। সবার মনে তখন একটাই অপেক্ষা ছিল—মদিনা আর কত দূর।
অবশেষে মদিনায় পৌঁছানো হয়। মসজিদে নববীর পরিবেশ, আজানের ধ্বনি ও প্রশান্ত শহর—সবকিছু মিলে মদিনার অনুভূতি যেন অন্য রকম ছিল। সেখানে দাঁড়ালে ব্যস্ত পৃথিবীটা একটু দূরে সরে যায়। এই সফরের সঙ্গে একটি বিশেষ স্মৃতি যুক্ত হয়। তারা ১২ রবিউল আউয়াল মদিনায় অবস্থান করছিল, যেদিন মুসলিম সমাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিন স্মরণ করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শহরে সেই দিনে থাকা তাদের সফরের স্মৃতিতে এক বিশেষ স্থান করে নেয়।
মতামত (0)