প্রবাসীতথ্য প্রাচুর্যে সত্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ
তথ্য প্রাচুর্যে সত্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব তথ্যপ্রবাহের মাঝেও সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা জনমত ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
মানবতার ইতিহাসে এমন সময় আগে কখনো আসেনি, যখন এত বিপুল তথ্য মানুষের হাতের নাগালে এত সহজে পাওয়া যায়। স্মার্টফোন ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর জানা সম্ভব হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা, ছবি ও ভিডিও দেখা এবং মানুষের মতামত শোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিতে, জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করতে, ভাষা অনুবাদ করতে এবং বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করছে। এই তথ্যসমৃদ্ধ যুগে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে: কেন এত তথ্যের মাঝে সত্যকে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে?
সমস্যাটি তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্য, মতামত, প্রচারণা, ভুল, অর্ধসত্য এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা একই প্রবাহে মিশে যাচ্ছে। একটি খবর সত্য কি না, তা যাচাই করার আগেই সেটি হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে এবং পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নাম, প্রতীকচিহ্ন বা শিরোনাম ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ তৈরি করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে বাস্তবের মতো দেখতে ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা আরও সহজ হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা সতর্ক করেছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত বিষয়বস্তু এবং ডিপফেক তথ্য ও প্রভাব বিস্তারের মধ্যকার সীমারেখাকে আরও অস্পষ্ট করে তুলছে।
এই বৈশ্বিক পরিবর্তন থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। বাংলাদেশি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা ৪ হাজার ১৯৫টি বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঘটনা শনাক্ত করেছে। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
একই প্রতিবেদনে ৬০৬টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ২১০টি বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঘটনা শনাক্ত করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৭৯ শতাংশ বেশি।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি বিভ্রান্তিকর তথ্যের পেছনে রয়েছে মানুষের সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস, সম্পর্ক বা জনমতকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা। একটি মিথ্যা তথ্য তৈরি হতে কয়েক সেকেন্ড লাগলেও, তার কারণে তৈরি হওয়া ভুল ধারণা দূর করতে অনেক বেশি সময় লাগে।
এখানেই বর্তমান সময়ের একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে তথ্যের সংকট ছিল, এখন সংকট হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বেছে নেওয়ার।
মানুষ কেন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য এত সহজে বিশ্বাস করে? এর কারণ হলো, মানুষ সব সময় শুধু সত্য খোঁজে না। অনেক সময় মানুষ নিজের বিশ্বাসের সমর্থন খোঁজে। কোনো খবর তার রাজনৈতিক বা সামাজিক মতের সঙ্গে মিলে গেলে সেটি যাচাই না করেই বিশ্বাস করতে পারে।
পছন্দের ব্যক্তি বা দলের পক্ষে গেলে সেটিকে সত্য মনে হতে পারে। আবার একই তথ্য তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গেলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলেও সেটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।
মানুষ অন্যের বিভ্রান্তিকর তথ্য সহজে দেখতে পেলেও, নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখতে অনেক সময় চায় না। সত্যের প্রতি দায়িত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এখানেই। যে মিথ্যা বিপক্ষের, সেটিকে মিথ্যা বলা সহজ। কিন্তু যে মিথ্যা নিজের পক্ষের, সেটিকেও মিথ্যা বলতে পারা সত্যের প্রতি প্রকৃত আনুগত্যের পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই মানবিক দুর্বলতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সেখানে যে তথ্য সবচেয়ে সত্য, সেটিই সব সময় সবচেয়ে বেশি ছড়ায় না। যে তথ্য মানুষের আবেগকে বেশি নাড়া দেয়, ভয় সৃষ্টি করে, ক্ষুব্ধ করে বা উত্তেজিত করে, সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে সত্য ও গতির মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সত্য যাচাই করতে সময় লাগে, কিন্তু মিথ্যা তৈরি ও ছড়াতে অনেক সময় কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট।
মানুষ যেন এমন এক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে যেখানে দেখেই প্রতিক্রিয়া দেওয়া হচ্ছে এবং শেয়ার করা হচ্ছে। অথচ সত্য জানার প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত ছিল অন্যরকম: দেখলাম, থামলাম, প্রশ্ন করলাম, যাচাই করলাম, তারপর মত দিলাম। এই ছোট্ট বিরতিটিই বর্তমান তথ্যযুগে একটি বড় নাগরিক দায়িত্ব।
তাই ‘তথ্য পাওয়া’ এবং ‘সত্য জানা’কে এক জিনিস ভাবা বন্ধ করতে হবে। একটি তথ্য সামনে এসেছে, এটুকু জানলেই সেটি জানা হয়ে যায় না। সত্যের কাছাকাছি যেতে হলে অন্তত কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার: কে বলেছে? উৎস কোথায়? প্রমাণ কী? তথ্যটির সময় ও প্রেক্ষাপট কী? অন্য নির্ভরযোগ্য উৎস কী বলছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হতে পারে: আমি কি এটি বিশ্বাস করছি; কারণ, এটি সত্য, নাকি এটি আমার বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে? এই শেষ প্রশ্নটি নিজেদের কাছেই করা প্রয়োজন।
মতামত (0)