সারাদেশ

কিশোরগঞ্জে নদীগর্ভে বিলীন অলওয়েদার সড়ক: দায় নিয়ে বিতর্ক

কিশোরগঞ্জে নদীগর্ভে বিলীন অলওয়েদার সড়ক: দায় নিয়ে বিতর্ক
কিশোরগঞ্জে নদীগর্ভে বিলীন অলওয়েদার সড়ক: দায় নিয়ে বিতর্ক
কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় নির্মিত অলওয়েদার সড়কের দেড় কিলোমিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় হাজারো মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এলজিইডি ও পাউবো দায় নিতে নারাজ।

কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার অলওয়েদার সড়কের অন্তত দেড় কিলোমিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হেঁটে যাতায়াতের উপায় নেই।

সব আবহাওয়ায় চলাচলের জন্য ২০১৭ সালে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৬ ফুট প্রশস্ত এই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। নির্মাণে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে ১৩ কোটি টাকার সংস্কারকাজ চলমান থাকা অবস্থাতেই সড়কটি ভাঙনের কবলে পড়েছে।

সড়কটির দেড় কিলোমিটারের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন নদীগর্ভে। ভাঙনের অংশটুকু পড়েছে বাঙ্গালপাড়া ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আমিনুল ইসলাম জানান, সড়কের পাশাপাশি প্রায় ৪০০ একর জমি নদীতে চলে গেছে এবং ১০টি পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, আগে এলাকার অনেক যুবক অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন অলওয়েদার সড়কে। এখন সড়ক বিলীন হওয়ায় সেই সুযোগও নেই। নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ফজলুর রহমান ভাঙনে ঘর হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

সড়কটি নদীগর্ভে চলে গেলেও এর দায় নিতে রাজি নয় সরকারের কোনো দপ্তর। এলজিইডি বলছে, তাদের দায়িত্ব শুধু সড়ক নির্মাণ করা, আর নদী থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)।

তবে পাউবো এই দায় নিতে নারাজ। পাউবো কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অলওয়েদার সড়ক নির্মাণে পানির চাপ, নদীর গতিপ্রকৃতি ও প্রবাহ বিবেচনায় বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। সড়কটির এ অবস্থার জন্য পাউবোর কোনো দায় নেই।

পাউবোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিশাল জলরাশির মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের আগে লিখিতভাবে এনওসি (অনাপত্তিপত্র) বা পরামর্শ নেওয়া হয়নি। সড়কটির প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব নদী রক্ষা নকশায় নেই।

এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক জানান, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সড়কে চারটি বড় সেতু ও দুটি পাইপ কালভার্ট রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, সড়কটি নির্মাণের সময় পাউবোকে লিখিতভাবে জানানো হয়নি। তবে পাউবোও কখনো কোনো আপত্তি জানায়নি।

মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ৯ বছর আগে যে বাস্তবতায় সড়কটি নির্মিত হয়েছিল, এখন নদীর গতিপথ, চর জাগায় ও স্রোতের ধরন বদলে গেছে। এতে ভাঙন বেড়েছে।

কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, সড়ক বানিয়েছে লোকাল গভর্নমেন্ট, কিন্তু নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের।

ভাঙন এলাকার নদীটি স্থানীয়ভাবে মেঘনা বা মেঘনার শাখা হিসেবে পরিচিত হলেও দাপ্তরিক নাম ধলেশ্বরী। বর্ষাকালে নদীতে পানি বাড়লে তা সড়কে এসে লাগে। নদীর পাশে সড়কের ভাঙন রক্ষায় শক্ত প্রতিরোধব্যবস্থা করা হয়নি।

দুই দপ্তরের এই টানাপোড়েনের মধ্যে সমাধান খুঁজতে মাঠে নামে বিআইডব্লিউটিএ। তারা ড্রেজিং করে সড়কের পাশ থেকে নদীর গতিপথ সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু এই চেষ্টা সফল হয়নি।

বাঙ্গালপাড়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের তিন অফিসের অফিসাররা যদি এক টেবিলে বসে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারত, তাহলে হয়তো চোখের সামনে রাস্তাটি এভাবে হারিয়ে যেত না।

অলওয়েদার সড়কের সঙ্গে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সংযোগ সেতু যুক্ত। সেতুটির একটি অংশ অষ্টগ্রাম, অপর প্রান্তটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় স্পর্শ করেছে। সেতুটি চালু হলে নাসিরনগরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ার কথা ছিল।

সড়ক ভাঙনের কবলে পড়ায় এই সংযোগ সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ৩০ জুলাই সরেজমিন দেখা যায়, সড়কটির নোয়াগাঁও অংশে বেশি ভেঙেছে।

সড়কটির নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে ১৭ মে অনলাইন ও পরদিন মুদ্রণ সংস্করণে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...