প্রবাসী

ল্যাম্পপোস্টের চোখে প্রবাসজীবনের গল্প

ল্যাম্পপোস্টের চোখে প্রবাসজীবনের গল্প
ল্যাম্পপোস্টের চোখে প্রবাসজীবনের গল্প
একটি ল্যাম্পপোস্টের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবাসজীবনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও এক মানবের প্রতি তার আন্তরিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

একটি ধাতব দণ্ড থেকে একটি ল্যাম্পপোস্টের জন্ম হয়েছিল। দণ্ডের একটি অংশ কেটে তার হাতল তৈরি করা হয়। এরপর তাকে একটি নতুন আবাসিক এলাকার রাস্তার পাশে মাটিতে বসানো হয় এবং হাতলে একটি বৈদ্যুতিক বাতি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

শুরুতে চারপাশে ঘন জঙ্গল থাকায় ল্যাম্পপোস্টের খুব ভয় লাগত। সেখানে খরগোশ চরে বেড়াতো এবং শিয়াল তাদের ধাওয়া করত। বনের ডোবার পাশে ঝোপের আড়ালে হাঁসেরা ডিম পাড়ত।

ডিম ফুটে তুলতুলে বাচ্চা বের হলে তারা মায়ের পিছু পিছু প্যারেড করে চলত। শিশুদের মতো কোমল কণ্ঠে তাদের প্যাক প্যাক শব্দ শুনতে ল্যাম্পপোস্টের বেশ ভালো লাগত। এভাবেই দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যেত।

ল্যাম্পপোস্টের রুটিন মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। সে সারা দিন দাঁড়িয়ে ঝিমাতো এবং সন্ধ্যা হলে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠত। এরপর সারা রাত নিঃসঙ্গ রাস্তা পাহারা দিত।

সকাল হওয়ার সাথে সাথেই সে আবার ঘুমিয়ে পড়ত। তার দিনগুলো বিমর্ষ এবং রাতগুলো ছিল নিঃসঙ্গ। মানুষগুলো সারা দিন শুধু দৌড়াতো, তাদের একটুও অবসর ছিল না।

মানুষের এই দৌড় শুরু হয় একেবারে শিশুকাল থেকেই। শিশুরা তাদের মা-বাবার দ্বারা শিশু পরিচর্যাকেন্দ্রে রেখে আসা হয়, এরপর স্কুলে যায় এবং বড়দের মতো জীবনচক্রের ফাঁদে আটকা পড়ে।

ল্যাম্পপোস্টের দিনগুলো বিমর্ষ লাগত, কারণ সে সারাদিন ক্লান্ত থাকত। মানুষের অবিরাম দৌড়ঝাঁপ দেখে তার ক্লান্তি আরও বাড়ত। রাতগুলো ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগত, কারণ মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে রাতে বাড়ির বাইরে বের হতো না।

শীতের সময় বাইরে ঠান্ডা এবং গরমের সময় বাইরে গরম পড়ে, এমন শত শত অজুহাত ছিল তাদের। রাতের বেলায় বাইরে বের হওয়াকে অনেকে স্বাভাবিক ভদ্রতার বরখেলাপ মনে করত।

মা-বাবারা টিভি বা মুঠোফোন নিয়ে বসত, আর সন্তানেরা বই-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। রাতে বাইরে বের হওয়া অনেকেই আবার নিরাপদ মনে করত না। এভাবেই তার নিস্তরঙ্গ দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।

মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের কুকুরগুলো এসে ল্যাম্পপোস্টের পায়ের কাছে প্রস্রাব করে তাকে কিছুটা কাতুকুতু দেওয়ার চেষ্টা করত। এরপর তার পেছনের বাসায় একটি নতুন পরিবার আসার পর থেকে তার সময় কাটানো ভিন্ন হয়ে ওঠে।

এই পরিবারের পুরুষ মানুষটির মাথায় যেন ছিট ছিল। তার কোনো কিছুই স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে মিলত না। তিনি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যেতেন।

কাজে যাওয়ার আগে তিনি ল্যাম্পপোস্টকে একবার হ্যালো বলে যেতেন, যখন তার হাতলের আলোটা তখনও জ্বলছিল। এরপর তিনি দিনের শেষে সন্ধ্যা নামার পর ফিরে আসতেন।

ফিরে এসেই তিনি ল্যাম্পপোস্টকে একটি হ্যালো বলে বাসায় ঢুকে পড়তেন। এরপর তিনি গোসল ও খাওয়া-দাওয়া করে তার বারান্দায় পা মেলে বসতেন।

বাংলাদেশের গ্রামে দাদি-নানিরা যেই ভঙ্গিমায় পায়ের ওপর নাতি-নাতিনিদের শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন, অনেকটা সেই ভঙ্গিতে তিনি বসতেন। আর পাশেই মুঠোফোনের পর্দায় ইউটিউবে গান ছেড়ে দিতেন।

তিনি চুপচাপ বসে আশপাশের পরিবেশ দেখতেন এবং মনে হতো দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। কখনো কোনো প্রতিবেশী হাঁটতে বের হলে তাদেরও হ্যালো বলতেন।

তবে মানুষটির একটি কাজ ল্যাম্পপোস্টের খুব মজার লাগত। তিনি বিড়াল দেখলেই তার ডাক নকল করতেন। সঙ্গে সঙ্গেই বিড়ালটি বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে তাকাতো।

যতবার তিনি ডাক দিতেন, বিড়ালটি ততবারই ফিরে ফিরে তাকাতো। মাঝেমধ্যে তিনি তার মেয়েকে ডেকে নিতেন, কারণ মেয়েটির বিড়াল খুবই পছন্দের প্রাণী।

অনেক দিন ধরেই মেয়েটি একটি পোষা বিড়ালের আবদার করে আসছে, কিন্তু মানুষটি রাজি হন না। তার কারণ হলো, বিড়ালটিকে দেখভাল করার মতো সময় তাদের কারও নেই।

পূর্ণিমা রাত এলেই মনে হতো এই মানুষটি পাগল হয়ে যেতেন। চাঁদের সঙ্গে তার কত যে কথা হতো, তার হিসাব ছিল না। তিনি বলতেন, চাঁদ আর সূর্যই তো তার সবকিছুর সাক্ষী।

তিনি একদিন থাকবেন না, কিন্তু চাঁদ-সূর্য ঠিকই পৃথিবীকে আলো দিয়ে যাবে। কী অদ্ভুত মানবজীবন। মহাকালের তুলনায় কতই-না ক্ষুদ্র তার ব্যাপ্তি।

অস্তিত্বের কথা বললে সেটা তো মহাবিশ্বের তুলনায় ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম। ল্যাম্পপোস্ট এখন তার মনের ভাবটা কিছুটা আঁচ করতে পারে।

এই মানুষটির কর্মকাণ্ড আর দশটা মানুষের মতো নয়। তিনি যে মেঝেতে বসে থাকেন, এটা নিয়েও তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...