প্রবাসী

একটি চলচ্চিত্র ও মানবিক বিবেকের প্রশ্ন: দ্য ভার্জিন স্প্রিং

একটি চলচ্চিত্র ও মানবিক বিবেকের প্রশ্ন: দ্য ভার্জিন স্প্রিং
একটি চলচ্চিত্র ও মানবিক বিবেকের প্রশ্ন: দ্য ভার্জিন স্প্রিং
ইনগমার বার্গম্যানের ‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং’ চলচ্চিত্রটি বিশ্বাস, ঈর্ষা, পাপ, প্রতিশোধ এবং ক্ষমার মতো গভীর মানবিক বিষয়গুলো অন্বেষণ করে। এটি একটি মেয়ের নির্মম হত্যা এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে মানুষের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইনগমার বার্গম্যানের ১৯৬০ সালের সুইডিশ চলচ্চিত্র ‘জংফ্রুক্যালান’, যার ইংরেজি নাম The Virgin Spring, একটি গভীর মানবিক গল্প তুলে ধরে। চলচ্চিত্রটি মানুষের বিশ্বাস, ঈর্ষা, পাপ, প্রতিশোধ, অপরাধবোধ এবং ক্ষমার মতো বিষয়গুলো অন্বেষণ করে। এটি শুধু একটি মেয়ের নির্মম মৃত্যুর গল্প নয়, বরং মানুষের ভেতরের পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মধ্যযুগীয় সুইডেন এই গল্পের পটভূমি। ধনী কৃষক তেরে এবং তাঁর স্ত্রী ম্যারিটা তাঁদের একমাত্র মেয়ে কারিনকে নিয়ে বসবাস করেন। কারিন আদরের এবং পরিবারের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এক তরুণী। একই বাড়িতে ইনগেরি নামের এক আশ্রিত তরুণীও তাদের সঙ্গে বাস করে।

কারিন যেন পরিবারের ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মধ্যে বেড়ে ওঠা এক তরুণী, যার পৃথিবী অনেকটাই সরল। অন্যদিকে, ইনগেরি সেখানে অনেকটাই আশ্রিত এবং তাকে কাজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কারিনের জন্য যেখানে ভালো পোশাক, ভালোবাসা ও সম্মান স্বাভাবিক বিষয়, ইনগেরির জীবনে সেই স্বাভাবিকতা নেই। এই পার্থক্যই ইনগেরির ভেতরে ধীরে ধীরে একটি অভিমান তৈরি করে।

ইনগেরির এই অভিমান ধীরে ধীরে ঈর্ষায় পরিণত হয়। কারিনের প্রতি তার বিরক্তি এতটাই গভীর হয় যে সে খাবারের মধ্যে একটি প্যাডা, অর্থাৎ ব্যাঙজাতীয় প্রাণী লুকিয়ে রাখে। দুজন তরুণী একই পথে গির্জার দিকে যাত্রা করে, কিন্তু তাদের ভেতরের পথ তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পথের মধ্যে কারিনের সঙ্গে তিনজন রাখালের দেখা হয়। কারিন সরল মনে নিজের খাবার তাদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। কিন্তু সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে রাখালরা কারিনকে ধর্ষণ করে এবং হত্যা করে। দূর থেকে ইনগেরি সেই ভয়াবহ ঘটনা দেখতে পায়।

ইনগেরি এই মুহূর্তে সাহায্য করতে পারে না, কিংবা করে না। ঈর্ষা তখন আর বিজয়ের অনুভূতি দেয় না, বরং তাকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সন্ধ্যার দিকে অপরাধীরা না জেনেই কারিনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরিবার তাদের অতিথি হিসেবে খাবার পরিবেশন করে।

তারা জানে না, যাদের ঘরে তারা বসে আছে, সেই ঘরের মেয়েকেই তারা হত্যা করেছে। একসময় কারিনের পোশাক দেখে ম্যারিটা বুঝতে পারেন, অতিথিরা আসলে কারা। তোরের সামনে তখন একজন পিতার শোক, একজন মানুষের ক্রোধ এবং একজন খ্রিষ্টান মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্ব একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়।

তোরে এরপর দুই প্রাপ্তবয়স্ক হত্যাকারীকে হত্যা করেন। এমনকি সেই কিশোর ছেলেটিও, যে পুরো ঘটনাটির সাক্ষী ছিল, তোরের প্রতিশোধ থেকে রেহাই পায় না। চলচ্চিত্রটি দর্শককে একটি অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে যায়। একটি ভয়ংকর অপরাধের বিচার করতে গিয়ে একজন বাবা নিজেই কি আরেকটি ভয়ংকর অপরাধ করে ফেললেন, এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়।

কারিনের হত্যার জন্য প্রতিশোধ কি ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধের মধ্যেও নতুন অন্যায় জন্ম নেয়, এই প্রশ্নও সামনে আসে। তোরের ক্রোধ শেষ হওয়ার পর তাঁর মনে অপরাধবোধ শুরু হয়। গল্পের শেষে, একটি ঝরনা যেন মানুষকে জিজ্ঞাসা করে, এত রক্ত, এত কান্না, এত প্রতিশোধের পরও কি মানুষের ভেতরে পবিত্রতার জন্য কোনো জায়গা বাকি থাকে?

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...