আন্তর্জাতিকমার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভোটার যাচাই ব্যবস্থা পুনর্বহাল
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভোটার যাচাই ব্যবস্থা পুনর্বহাল
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গতকাল ট্রাম্প প্রশাসনের সম্প্রসারিত অভিবাসন ডেটাবেস ব্যবহারের পথ পুনরায় খুলে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকানো, তবে সমালোচকরা যোগ্য ভোটারদের বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গতকাল শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সম্প্রসারিত অভিবাসন ডেটাবেস ব্যবহারের পথ পুনরায় খুলে দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই ব্যবস্থা অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে সাহায্য করবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে যোগ্য ভোটাররাও ভুলভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
বিচারপতিরা বিচার বিভাগের আবেদন মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের একটি আদেশ স্থগিত করেছেন। ওই আদেশের কারণে অঙ্গরাজ্যগুলো ফেডারেল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিবন্ধিত ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ে সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করতে পারছিল না। সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারপতিদের ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। গতকালের আদেশে তিন উদারপন্থী বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা বলেছেন, বাদীদের যুক্তি শেষ পর্যন্ত টিকবে না-ও পারে। কারণ ফেডারেল আইন অনুযায়ী, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য নিতে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটপ্রক্রিয়ায় ফেডারেল সরকারের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার মূল এখতিয়ার অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে।
গত বছর ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ‘সিস্টেমেটিক এলিয়েন ভেরিফিকেশন ফর এনটাইটেলমেন্টস’ বা ‘সেভ’ ডেটাবেসটি নতুন করে সাজায়। এতে একসঙ্গে অনেক রেকর্ড অনুসন্ধান এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর ব্যবহার করে তথ্য খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিএইচএস-এর জেনারেল কাউন্সেল জেমস পার্সিভাল বলেন, সরকারি ডেটা ব্যবহার করে অঙ্গরাজ্যগুলোকে অ-নাগরিকদের অবৈধভাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়তার জন্যই সুপ্রিম কোর্টে জরুরি আবেদন করা হয়েছে।
ডেটাবেসটির পরিধি বাড়ানোর পর রিপাবলিকান-শাসিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ভোটার তালিকার সঙ্গে এর তথ্য মিলিয়েছে। এতে সম্ভাব্য অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত কিছু ভোটারের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, নির্বাচনের নিরাপত্তার চেয়ে ভোটার সংখ্যা কমিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি এখানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে যোগ্য ভোটাররা—যাদের অনেকেই ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা—ভোটাধিকার হারাতে পারেন।
ট্রাম্প অভিবাসন বিষয়ে কঠোর নীতি নিয়েছেন এবং ব্যাপক ভোট জালিয়াতির দাবি করে আসছেন। এর মধ্যে ২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে তাঁর পরাজয়ের বিষয়টিও রয়েছে। মামলাকারী অধিকার সুরক্ষা সংগঠনগুলোর দাবি, সংশোধিত সেভ ব্যবস্থায় অনেক মানুষকে ভুলভাবে অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মতে, ডেটাবেসের তথ্য অনেক সময় সেকেলে হওয়ায় বৈধ নাগরিক ও ভোটাররাও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন।
ব্যবস্থাটির সামগ্রিক ত্রুটির হারও প্রকাশ্যে জানা নেই; ডিএইচএস ও বিচার বিভাগ এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। বাদীদের প্রতিনিধিত্বকারী ‘সিটিজেনস ফর রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড এথিকস ইন ওয়াশিংটন’ সিদ্ধান্তটিকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অবিশ্বস্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতি কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন লিখেছেন, অল্পসংখ্যক বৈধ ভোটারের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো বা তাঁদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষতি সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়ে বেশি। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা নথিতে টেক্সাসের ট্রাভিস কাউন্টির একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা জানান, সেভ-তে অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ২৫ শতাংশই আগে মার্কিন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়েছিলেন। মিসৌরির সেন্ট লুইস কাউন্টিতে ব্যবস্থাটির দেওয়া ফলাফলের অন্তত ৮১ শতাংশ ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
‘লিগ অব উইমেন ভোটারস’ ও ‘ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টার’ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংশোধিত সেভ ব্যবস্থা স্থগিতের দাবিতে মামলা করে। তাদের দাবি, এই পরিবর্তন ফেডারেল গোপনীয়তা আইনসহ অন্যান্য আইন লঙ্ঘন করেছে। ওয়াশিংটন ডিসির ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ স্পার্কল সুকনানান জুনে ডেটাবেসটির কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেন। তিনি ব্যবস্থাটিকে বিশৃঙ্খলভাবে তৈরি এবং নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত তথ্যকে অবিশ্বস্ত বলে উল্লেখ করেন।
৪ সেপ্টেম্বর ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া সার্কিটের ইউএস কোর্ট অব আপিলস ২-১ ভোটে ওই রায় স্থগিত করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে যায়। বিচার বিভাগের আইনজীবীরা নিম্ন আদালতের আদেশকে ‘অসমর্থনযোগ্য’ এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের ‘অখণ্ডতার জন্য হুমকি’ বলে দাবি করেন। প্রশাসনের সমর্থনে মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়া টেক্সাস ব্যবস্থাটি নির্ভরযোগ্য নয়—এমন দাবিও চ্যালেঞ্জ করেছে। এদিকে ফ্লোরিডায় পৃথক আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ফ্লোরিডা, আইওয়া, ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওতে সংশোধিত সেভ ব্যবস্থা ব্যবহার অব্যাহত রাখতে পারছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মতামত (0)