জাতীয়মহানগরগুলো মাদকের বড় বাজার: সীমান্ত থেকে সারাদেশে ছড়াচ্ছে চালান
মহানগরগুলো মাদকের বড় বাজার: সীমান্ত থেকে সারাদেশে ছড়াচ্ছে চালান
দেশের আটটি প্রধান মহানগর মাদক ব্যবসার বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত থেকে আসা মাদকের চালান এসব মহানগর হয়ে সারাদেশে ছড়াচ্ছে, যেখানে প্রায় ২৯ শতাংশ গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন।
দেশের আটটি প্রধান মহানগর এখন মাদকের বড় বাজার হয়ে উঠেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট মহানগরীতে মাদকের ব্যাপক বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের বড় চালানগুলো এসব মহানগর হয়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের আট মহানগরে পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে ৪৭ হাজার ৯৪৮টি। সারা দেশে এ ধরনের মোট বিচারাধীন মামলা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩টি। অর্থাৎ প্রায় ২৯ শতাংশ মামলাই এই আট মহানগরে নথিভুক্ত হয়েছে।
মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব জেলা দিয়ে মাদক দেশে ঢোকে, দেশের ভেতরে তা পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট এবং বড় বাজারের এলাকাগুলোতেই গুরুতর মাদক মামলার চাপ বেশি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, প্রায় সব মাদকই সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে, তাই সীমান্তবর্তী জেলায় মামলার চাপ বেশি।
গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে একটি ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। চট্টগ্রামে এক দিন যাত্রাবিরতির পর এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠে এবং ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই কুমিল্লায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ গাড়িটি আটক করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত পাঁচ মাসে শুধু কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত থেকেই ছয়টি বড় ঘটনায় প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এই পাঁচটি চালানের গন্তব্যই ছিল ঢাকা, পরে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এগুলো চলে যাওয়ার কথা ছিল। গত ৭ আগস্ট কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ইয়াবাসহ মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে কক্সবাজারের নাম সবার মুখে মুখে। সীমান্ত দিয়ে আসা এই ইয়াবা সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের মাদকের বড় অংশই সীমান্ত পার হয়ে আসে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজার ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এক অভিযানে বিজিবি ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র জানায়, কক্সবাজারে মাদক ঢোকার পর চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় চালান যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত পাওয়া যায়। অন্যদিকে ভারত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা দিয়েও মাদক দেশে ঢোকে। এই প্রবাহের শেষ ভাগে বড় শহরগুলোতে বিক্রি ও ব্যবহারের বাজার তৈরি হচ্ছে।
ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য মাদক মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আট মহানগরের মধ্যে ঢাকা মহানগরে ২১ হাজার ৯২০টি গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন। এরপর চট্টগ্রাম মহানগরে ১৫ হাজার ৪৪টি মামলা রয়েছে। শুধু এই দুই মহানগরেই মামলা রয়েছে ৩৬ হাজার ৯৬৪টি, যা আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশ।
এছাড়া রাজশাহী মহানগরে ৪ হাজার ১২১টি, গাজীপুর মহানগরে ২ হাজার ৬২৩টি, রংপুর মহানগরে ১ হাজার ২১৮টি, খুলনা মহানগরে ১ হাজার ১৮৭টি, বরিশাল মহানগরে ১ হাজার ২১টি এবং সিলেট মহানগরে ৮১৪টি গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, পাচারকারীরা বড় শহরে মাদকের বাজার তৈরির কয়েকটি সুবিধা কাজে লাগায়। বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে ক্রেতা বেশি, পরিবহনব্যবস্থা বিস্তৃত এবং ভাড়া বাসা ও অস্থায়ী আবাসে মাদক রাখা তুলনামূলক সহজ।
এছাড়াও সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগ ব্যবহার করে দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় মাদকের চালান সরানো যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসাল্ট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) একটি গবেষণা করে। এতে বলা হয়, দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মাদক সেবনকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেছেন, মাদক সহজেই পাওয়া যায়। আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, সীমান্ত থেকে নগর পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা ঠেকাতে না পারলে কখনোই মাদক প্রতিরোধ করা যাবে না। ঝিনাইদহের মহেশপুরে ৫৮ বিজিবির সদর দপ্তরে শতকোটি টাকার মাদকদ্রব্য ধ্বংস করা হয়।
মতামত (0)