প্রবাসী

অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা: প্রবাসীদের টিকে থাকার সংগ্রাম

অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা: প্রবাসীদের টিকে থাকার সংগ্রাম
অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা: প্রবাসীদের টিকে থাকার সংগ্রাম
উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের চাপে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী ঋণের বোঝা শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। গবেষণা অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে তাদের গড়ে দশ মাসের বেশি সময় লাগে।

জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো অনেক বাংলাদেশি কর্মী উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের চাপে টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য ধারদেনা করে এবং জমি বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করলেও, সেই ব্যয় তুলতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক কর্মী ঋণের বোঝা শোধ করার আগেই অবৈধ হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা ইয়াসিন হামিদ এমন একজন কর্মী। তিনি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে যান। সেখানে এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকায় একটি ‘ফ্রি ভিসা’ কেনেন এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার মোট পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়।

ইয়াসিন এই অভিবাসন ব্যয় মেটাতে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ করেন। বাকি তিন লাখ টাকা তিনি জমি বিক্রি করে সংগ্রহ করেন। বিদেশে যাওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও তিনি তার মোট ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি টাকা এখনো তুলতে পারেননি।

কাতার থেকে ইয়াসিন বলেন, “এখানে আসার পর মাসে এক হাজার রিয়াল বেতন দিচ্ছে। এর বাইরে কোনো আয় নেই আমার।” তিনি আরও জানান, থাকা-খাওয়া মিলিয়ে মাসে তার খরচ ৫০০ রিয়াল। “চলতি বছরের ইকামা করতে খরচ হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা,” যোগ করেন তিনি। জীবনযাপনের খরচ ও ইকামার টাকা শেষে সামান্য কিছু অবশিষ্ট থাকে, যা তিনি দেশে পাঠাতে পারেন বলে উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রমশক্তি জরিপের (এলএফএস) তথ্যের ভিত্তিতে গত বছর পরিচালিত ‘কস্ট অব মাইগ্রেশন’ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২২ সালে এই ব্যয় ছিল তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে চার লাখ ১৭ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে এই ব্যয় আরও বেড়ে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।

দুই বছরের ব্যবধানে অভিবাসন ব্যয় ২১ শতাংশ বেড়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিলে প্রকৃত ব্যয় প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকার কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে গড়ে ১০ দশমিক ২ মাসের আয় ব্যয় করতে হয়। ফিলিপাইনের কর্মীদের ক্ষেত্রে একই খরচ তুলতে মাত্র ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৪ মাস সময় লাগে।

আইএলও জানিয়েছে, স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ ক্রমাগত কমছে এবং শ্রম অভিবাসন সাধারণ মানুষের জন্য কম সহজলভ্য হয়ে উঠছে। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রম অভিবাসনের খরচ এখনো অত্যন্ত বেশি এবং গত কয়েক বছরে তা আরও বেড়েছে।

আইএলও-এর ২০২৪ সালের ব্যয়ের গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশিদের অভিবাসন ব্যয়ের বড় অংশই দালাল ও ভিসা-সংক্রান্ত খাতে যাচ্ছে। মোট ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ ভিসা-সংক্রান্ত খাতে এবং ৩৫ শতাংশ দালাল বা রিক্রুটার ফি হিসেবে ব্যয় হয়েছে। বাকি ২৭ শতাংশ অন্যান্য খাতে খরচ হয়েছে।

অর্থাৎ, মোট অভিবাসন ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই ভিসা ও মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর খাতে ব্যয় হচ্ছে। কাতারপ্রবাসী ইয়াসিন জানান, “ফ্রি ভিসা বলতে আসলে কোনো ভিসা নেই। এখানে এসে নিজ উদ্যোগেই ইকামা করা লাগে। কোনো না কোনো কফিলের অধীনে থাকা লাগে, না হলে অবৈধ হতে হয়।” তিনি আরও বলেন, “এখানে এসে দেখি অনেকে ফ্রি ভিসা দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকা দিয়েও কেনেন। এরপর শুধু বিমানভাড়া। কিন্তু দালালরা এই ভিসা তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায়ও বিক্রি করেন।”

ইয়াসিন বলেন, ফ্রি ভিসায় এসে নিজেই কাজ খুঁজতে হয়। “এখন কাজ নেই, যুদ্ধের কারণে খাবার খরচও বেশি। তাই এর মাঝে ঋণও শোধ করতে পারিনি। মন চাইলে দেশে যাওয়ারও টাকা নেই,” তিনি যোগ করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমিকদের মাসিক আয় ২০২২ সালের ৩৭ হাজার ৬২৯ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৪৫ হাজার ৪৪২ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ আয় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে প্রকৃত আয় প্রায় ৩৮ হাজার টাকার কাছাকাছি স্থির রয়েছে।

আয়ের এই বৃদ্ধি অভিবাসন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। রিক্রুটমেন্ট কস্ট-টু-ইনকাম অনুপাত অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে ২০২২ সালে গড়ে ১০ দশমিক ৩ মাস, ২০২৩ সালে ৯ দশমিক ৯ মাস এবং ২০২৪ সালে ১০ দশমিক ২ মাস সময় লেগেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...