জাতীয়অপরাধের শিকার ব্যক্তির প্রতি সামাজিক দায়
অপরাধের শিকার ব্যক্তির প্রতি সামাজিক দায়
অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই দায়ী করার সংস্কৃতি সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে, যা ভুক্তভোগীর আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই অনেক সময় সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, যা ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতির অংশ। এই প্রবণতা অপরাধের মূল আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে ভুক্তভোগীর চরিত্র, আচরণ, পোশাক বা জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এর ফলে অপরাধের শিকার মানুষটির আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়।
এক ব্যক্তি জানান, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার নামে একটি বড় খাম কুরিয়ারে আসে। প্রেরকের নাম-ঠিকানা ছিল অজ্ঞাত। খাম খোলার পর ভেতর থেকে উপহারসামগ্রী ও একটি চিঠি বের হয়। চিঠিটি পড়ার পর তার মা-বাবা হতবাক হয়ে তাকে প্রশ্ন করেন, "তোমার কাছে কেন এটা এসেছে?"
সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারছিলেন না তার অপরাধ কী। কোনো অপরাধ না করেও নিজেকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। লজ্জায় তিনি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছিলেন এবং নিজেকে ধিক্কার দিতে শুরু করেন। তার মনে হয়েছিল, নিশ্চয়ই তার কোথাও ভুল হয়েছে, নাহলে এমন চিঠি তার কাছে কেন আসবে।
এই ঘটনা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতির একটি উদাহরণ। এই সংস্কৃতি অপরাধের শিকার ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দেয় এবং তার চরিত্র, আচরণ, পোশাক, পরিবার বা জীবনযাপন নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্নগুলোর আড়ালে অপরাধীর মূল অপরাধ ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়।
ভুক্তভোগীকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পেছনে মূলত সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো কাজ করে। এই কাঠামো সব সময় দুর্বলকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। এটি এতটাই শক্তিশালী যে, অপরাধীর আচরণ ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীর আচরণ বিশ্লেষণ করতে শুরু করে।
প্রায়শই প্রশ্ন করা হয়, "ভুক্তভোগী কেন সেখানে গিয়েছিলেন?", "পরিবার তাকে কেন দেখভাল করেনি?", "তিনি আগে কেন বলেননি?", "তার পোশাক কেমন ছিল?", "তার চরিত্র কেমন ছিল?"। এসব প্রশ্নের ধূম্রজাল অপরাধীর দায়ভার হালকা করে দেয়। ভুক্তভোগীকে সন্দেহ করা যত সহজ হয়, অপরাধীর অপরাধের দায় ততই কম মনে হয়।
নারীর প্রতি ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সঙ্গে সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সংস্কৃতি শিশুদের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুটির মা-বাবার জীবনযাপন, শিক্ষা, পারিবারিক সম্পর্ক বা সন্তান পালনের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
আলোচিত শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোয় দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও আলোচনার একটি অংশ ভুক্তভোগী শিশু এবং তার পরিবারের দিকে ঘুরে যায়। শিশুর প্রতি ঘটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পরিবর্তে তার আচরণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। একটি শিশুর পোশাক বা আচরণ কখনোই তার প্রতি সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয় না।
একটি শিশুর অবাধ্যতা কাউকে তাকে আঘাত করার অধিকার দেয় না। কোনো শিশুর একা ঘরের বাইরে যাওয়া কাউকে তাকে অপহরণ করার বৈধতা দেয় না। এমনকি কোনো শিশুর কারও সঙ্গে কথা বলাও তাকে নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। এসব যুক্তি দিয়ে শিশুর প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়শই আদালতের রায় হওয়ার আগেই অপরাধের রায় হয়ে যায়। এই রায়ে অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে ভুক্তভোগীকেই বেশি দায়ী করা হয়। এটি পরবর্তী সময়ে বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। এভাবে একজন ভুক্তভোগীকে তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধের বিরুদ্ধে, সামাজিক সন্দেহের বিরুদ্ধে এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দফায় দফায় লড়তে হয়।
এই সামাজিক ব্যাধিকে রুখে দেওয়া জরুরি। এই পরিবর্তনের সূচনা পরিবার ও সমাজ থেকে হতে হবে। পুলিশ, হাসপাতাল, আদালত, স্কুল, পরিবার, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগকারীর চরিত্র নয়, বরং অভিযোগের তথ্য ও প্রমাণ তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় রিপোর্টিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ও আইনি সহায়তা এবং যেখানে দরকার, সেখানে সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
মতামত (0)