জাতীয়পানামা খালে জাহাজ পারাপারে রেকর্ড মাশুল, ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয়
পানামা খালে জাহাজ পারাপারে রেকর্ড মাশুল, ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয়
বিশ্বজুড়ে নৌপথে পণ্য পরিবহনে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। পানামা খাল পার হতে কয়েকটি বড় পণ্যবাহী জাহাজকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়েছে, যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বজুড়ে নৌপথে পণ্য পরিবহনে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি পানামা খাল পার হতে কয়েকটি বড় পণ্যবাহী জাহাজকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানামা খালের প্রশাসক ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা জানান, কিছু জাহাজকে খাল দিয়ে যাওয়ার জন্য ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে। তার মতে, এই মাশুল রেকর্ড পর্যায়ের। চলতি বছরের গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত নিলামে কোনো কোনো জাহাজের মাশুল ১০ লাখ ডলারের বেশি উঠেছিল।
অথচ ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, বাজারই দাম ঠিক করে। তিনি আরও মনে করেন, ভবিষ্যতে কিছু জাহাজের জন্য আবার ২০ লাখ বা ৩০ লাখ ডলারের দর উঠতে পারে।
প্রায় ৫০ মাইল দীর্ঘ পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৬ শতাংশ পণ্য এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই খাল দিয়ে চলাচলকারী বেশিরভাগ জাহাজই কয়েক মাস আগে চলাচলের আগাম সময় নির্ধারণ করে রাখে।
মোট জাহাজ চলাচলের প্রায় ৯০ শতাংশের সূচি এভাবে আগাম সংরক্ষণ করা হয়। খাল দিয়ে জাহাজ পার হওয়ার এই ব্যবস্থা মূলত মিঠাপানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। জাহাজে কী ধরনের ও কত পরিমাণ পণ্য আছে, তার ওপর সাধারণত আগাম সংরক্ষণের খরচ নির্ভর করে।
সব সময় আগাম সংরক্ষণ দেওয়া হয় না। কিছু সূচি নিলামের জন্য রেখে দেওয়া হয়, যাতে জরুরি প্রয়োজনে কাছাকাছি সময়ে জাহাজ পার করা যায়। বর্তমানে এসব সূচির নিলাম শুরু হয় ১ লাখ ডলার থেকে। চলতি মৌসুমে নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, নির্দিষ্ট দিনে জরুরি ভিত্তিতে খাল পার হতে চাওয়া কিছু জাহাজ অনেক বেশি দর দেয়। সম্প্রতি যে মাশুল ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলারে উঠেছে, তার পেছনে মূলত এই জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বহনকারী ট্যাংকারগুলো পানামা খাল ব্যবহার করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শস্য, চিলির ওয়াইন ও চীনের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যও এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়। পানামা খাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, এরপর চীন।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের পথেও পরিবর্তন এসেছে। এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় বন্দর থেকে এশিয়ার বাজারে গ্যাস পাঠানোর চাপ বেড়েছে। নরওয়ের অসলোভিত্তিক সামুদ্রিক পরিবহন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, জ্বালানির ঘাটতি প্রতিদিনই বাড়ছে, বিশেষ করে এশিয়ায়।
এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো সাধারণত আগে থেকেই পানামা খালের সূচি সংরক্ষণ করে না। ফলে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের নিলামে অংশ নিয়ে চড়া দামে সূচি কিনতে হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ইউরোপে এলএনজির চাহিদা বেড়ে যায়।
তখন এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো পানামা খাল ব্যবহার কমিয়ে ইউরোপের দিকে যেতে শুরু করে। এখন তারা আবার পানামা খালে ফিরছে। ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস বেশি যাচ্ছে।
সে কারণে পানামা খাল দিয়ে এলএনজি পরিবহন আবার বাড়ছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে তিন থেকে চার মাসের জন্য পানামা খালে জাহাজ চলাচল বেড়েছিল। তখন প্রতিদিন ৩৮ থেকে ৪১টি জাহাজ খাল পার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ৩৪ থেকে ৩৬টি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।
তবে সম্প্রতি চরম আবহাওয়ার কারণে পানামা খাল কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন জাহাজ পারাপারের সংখ্যা ৩২-এ নামিয়েছে। এল-নিনোর কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজার ও উপকূলীয় অবকাঠামোয় প্রভাব ফেলছে।
খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের খরচ বেড়ে গেলে শুধু জাহাজভাড়া নয়, শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামও বাড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব খুব একটা পড়বে না বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হলো ইউরোপ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি বাণিজ্য বাড়লেও সে দেশে যাওয়ার একাধিক পথ আছে। ফলে পানামা খালের মাশুল বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য খুব একটা বড় সমস্যা নয়।
মতামত (0)