প্রবাসী

অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশি তরুণ সোহানের পদোন্নতি

অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশি তরুণ সোহানের পদোন্নতি
অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশি তরুণ সোহানের পদোন্নতি
নাজমুস সোহান নামের এক বাংলাদেশি তরুণ অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে সরাসরি অফিসার পদে যোগ দিয়ে অল্প সময়ে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

নাজমুস সোহান নামের এক বাংলাদেশি তরুণ অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে সরাসরি অফিসার পদে যোগ দিয়েছেন। তিনি অতি অল্প সময়ে উচ্চতর ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট’ পদে পদোন্নতি লাভ করেছেন। এই অর্জন তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প তুলে ধরে।

২০২৩ সালে নাজমুস সোহান ব্যবসায়িক সাফল্যের শীর্ষে থাকা অবস্থায় এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। প্রথাগত কোনো সামরিক বা উড়োজাহাজ চালনার ডিগ্রি ছাড়াই তিনি বাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ আট বছরের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সরাসরি ‘ফ্লাইং অফিসার’ হিসেবে নিযুক্ত হন।

বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাকে অত্যন্ত কঠিন পথ পার হতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের গভীর ও জনমানবহীন জঙ্গলে তার ‘কমব্যাট সারভাইভাল’ প্রশিক্ষণ। এই কোর্সে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা শত্রুপক্ষের সীমানায় আটকা পড়লে কীভাবে বেঁচে ফিরতে হয়, তা শেখানো হয়।

সম্পূর্ণ একা, জনহীন জঙ্গলে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া, হিংস্র বন্য প্রাণীর ভয় ও সীমিত রসদ নিয়ে আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করা ছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। এই চরম পরীক্ষা তিনি সফলভাবে পার করেন।

মেধা ও কঠোর শৃঙ্খলার জোরে মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০২৬ সালের ২ জুন তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট’ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের এডিনবরা বিমানঘাঁটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের দায়িত্বে নিয়োজিত।

এই রাজকীয় বাহিনীতে নিজের অবস্থান নিয়ে নাজমুস সোহান বলেন, "আমার জানামতে, এই সম্মানজনক কমিশনড অফিসার পদে একজন ইমাম ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশি এখন পর্যন্ত নেই।" তিনি আরও জানান, তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন অনেক বাংলাদেশি তরুণ জুনিয়র পদে যোগ দিয়েছেন।

অনেকেই তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন এবং কীভাবে এই বাহিনীতে আসা যায়, সেই খোঁজখবর নিচ্ছেন। সোহান সাধ্যমতো তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "অধ্যবসায়, সততা আর নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছুই কঠিন নয়।"

তিনি আরও বলেন, "সঠিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে যেকোনো দেশের রাজকীয় বাহিনীতেই বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা সম্ভব।" এই বক্তব্য তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

নাজমুস সোহানের পৈতৃক নিবাস সাতক্ষীরার তালা থানায়। তবে তার বেড়ে ওঠা খুলনার ডুমুরিয়ায়, বাবার সরকারি চাকরি ও মায়ের নার্সের দায়িত্বের সুবাদে। ১৩ বছর বয়সে এক ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মা-বাবাকে হারান।

ডুমুরিয়ার স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ২০১৩ সালে তিনি ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসায় প্রশাসনে ভর্তি হন। পরে ২০১৫ সালে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন।

সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ এবং অভিভাবকহীন জীবনের শূন্যতার মধ্যেও তিনি নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি তার ভেতরের উদ্যোক্তাসত্তা তাকে ব্যবসার দিকে টানে। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় তিনি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাখা বিস্তার করেন।

মেলবোর্ন থেকে ব্রিসবেন এবং পরে সিডনিতে তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখা খোলেন। ২০১৮ সালের মধ্যেই তিনি অ্যাডিলেডে নিজস্ব বাড়ি কেনেন। ২০২০ সালে তিনি নিজের একটি নিবন্ধিত প্রশিক্ষণ কলেজ গড়ে তোলেন।

এই অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনামূলক দক্ষতাই পরবর্তী সময় তাকে অস্ট্রেলীয় বিমানবাহিনীতে সরাসরি অফিসার পদে নির্বাচিত হতে সাহায্য করে। তিনি দীর্ঘ আট বছরের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।

২০১৬ সালে নাজমুস সোহান সুরাইয়া মান্নানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সুরাইয়া মান্নান বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় যোগাযোগ সংস্থায় ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তাদের এক বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে, যার নাম ‘সিজদা’।

কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার মধ্যেও সোহান তার ফেলে আসা ডুমুরিয়াকে ভোলেননি। প্রচারের আড়ালে থেকে তিনি নিজ এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। ঘর তৈরি করে দেওয়া, শীতবস্ত্র বিতরণ, মসজিদ নির্মাণ এবং অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...