জাতীয়অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নিয়মে বড় পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নিয়মে বড় পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থায় বড় সংস্কার ঘোষণা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের জন্য নতুন নিয়ম নিয়ে এসেছে। আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে এই পরিবর্তনের কথা জানান। এই সংস্কার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে জানানো হয়েছে।
সিডনি ও মেলবোর্নের মতো বড় শহরগুলোতে আবাসন ভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়ভার এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এই দুটি সংকট অস্ট্রেলিয়ার জনপরিসরে অভিবাসনকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত করেছে। দীর্ঘদিনের এই জনক্ষোভ এবং রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে অভিবাসীদের ওপর দায় চাপানো হয়েছিল।
নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এখন থেকে নতুন আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা তাঁদের স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের অস্ট্রেলিয়ায় আনতে পারবেন না। গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হবে। তবে ডক্টরেট বা পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা এই কড়াকড়ি থেকে মুক্ত থাকবেন। ইতিমধ্যে যাঁরা পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁদের পরিবার বিচ্ছিন্ন করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।
ভিসা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ফাঁকফোকর বন্ধ করতেও নতুন নিয়ম আনা হয়েছে। এতদিন অনেকে পড়াশোনা শেষে দেশে না ফিরে বা স্থায়ী আবাসনের শর্ত পূরণ করতে না পেরে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য নিচু স্তরের কারিগরি বা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতেন। এই ধরনের 'ভিসা হপিং' সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীকে কেবল উচ্চতর স্তরের যোগ্যতায় যেতে হবে; যেমন স্নাতক শেষ করলে স্নাতকোত্তরে যাওয়া যাবে, কিন্তু ভিসা টিকিয়ে রাখার জন্য নিচের স্তরের ডিপ্লোমায় নামা যাবে না।
পর্যটক বা ভিজিটর ভিসায় স্থায়ী হওয়ার পথও রুদ্ধ করা হয়েছে। ভ্রমণ ভিসায় বাধ্যতামূলকভাবে 'অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই' (নো ফারদার স্টে) শর্ত যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে ভ্রমণের ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে অনশোরে শিক্ষার্থী বা অন্য ভিসায় আবেদনের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে যাবে।
অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসনেও সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করা প্রায় ৭৭ হাজার অবৈধ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে। এই লক্ষ্যে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীতে নতুন ১০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং মেলবোর্নের পুরোনো কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা হবে।
দক্ষ অভিবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পরিবর্তন করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবাসনসংকট মোকাবিলায় নির্মাণ খাতের কারিগরি দক্ষতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রির সমান পয়েন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকতা ও কৃষিশ্রমের মতো ঘাটতি থাকা খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এই সংস্কারগুলোকে অভিবাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ফাঁকফোকর বন্ধের প্রশাসনিক তাগিদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আসন্ন ফেডারেল নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের জনমত ধরে রাখার একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল হিসেবেও এর প্রেক্ষাপট আলোচিত হচ্ছে। গত দুই দশকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ চাহিদাভিত্তিক ছিল, যার ফলে বিদেশি শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশই অস্থায়ী অভিবাসী, যা প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে। এর ফলে আবাসন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে অনিয়ম, অসৎ শিক্ষা এজেন্টদের দৌরাত্ম্য এবং নামকাওয়াস্তে কলেজের ব্যবসা বন্ধ করতে নিয়মনীতি কঠোর করাকে যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ঘোষণার সময় এবং পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে এর পেছনের রাজনৈতিক চালটি অত্যন্ত স্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনের দল 'ওয়ান নেশন' অভিবাসীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে আবাসনসংকটের ভয় দেখিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছিল। জনমত জরিপে তারা বিরোধী জোটের চেয়েও এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ক্ষমতাসীন লেবার দলের ভোটে ভাগ বসাচ্ছিল। বিরোধী দলও অভিবাসী কমানোর দাবি জানাচ্ছিল।
মতামত (0)