জাতীয়

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি: ভুট্টোর সঙ্গে সাদৃশ্য

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি: ভুট্টোর সঙ্গে সাদৃশ্য
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি: ভুট্টোর সঙ্গে সাদৃশ্য
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভাগ্যকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সামরিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে উভয় নেতার সম্পর্ক এবং তাদের পরিণতিতে সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির সামরিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে উভয় নেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। একসময় সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রিয়পাত্র ছিলেন ভুট্টো, এখন ইমরান খানও একই ধরনের পরিণতির পথে রয়েছেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো একসময় পাকিস্তানের সামরিক আমলাতন্ত্রের সমর্থন পেয়েছিলেন। তার সমস্যা শুরু হয় যখন তিনি পারমাণবিক বোমা কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান। এর ফলস্বরূপ, ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং কিছুদিন পরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা আগেও ভুট্টো জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ভুট্টো তার সামনে কী অপেক্ষা করছে তা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে আটক করা হয়। ১৯৭৮ সালের মার্চে ভুট্টোর ফাঁসির আদেশ হয় এবং পরের বছরের ২৪ মার্চ উচ্চ আদালতে সেই আদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপরের মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাওয়ালপিন্ডি কারাগারে সেই আদেশ কার্যকর করা হয়েছিল।

জেনারেল জিয়া-উল-হক ১৯৮৮ সালে রাওয়ালপিন্ডির ওই কারাগারটিও ভেঙে ফেলেন। সেখানে বর্তমানে 'জিন্নাহ পার্ক' তৈরি করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক আমলাতন্ত্র জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের পছন্দ করে না, কারণ এতে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একাধিপত্য বাধাগ্রস্ত হয়। সামরিক আমলাতন্ত্র, ভুট্টো ও শরিফ বংশ এবং ওয়াশিংটনের সমর্থন মিলে একটি শক্তিশালী ত্রিভুজ তৈরি হয়েছিল।

আদালতে ভুট্টোর ফাঁসির রায় হওয়ার পরও সাধারণ পাকিস্তানিরা ভেবেছিল এটি বদলাবে। ভুট্টো নিজেও এমন কিছু বিশ্বাস করতেন। তবে ফাঁসির আগেই তিনি প্রিয়ভাজন জেনারেলের নির্মমতা দেখেছিলেন। আটক ও ফাঁসির মাঝের সময়ে কারাগারে ভুট্টোকে তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছিল। তাকে মাসের পর মাস আলো-বাতাসহীন একটি কক্ষে রাখা হয়।

ভুট্টোর খাবারে কাচের গুঁড়া মিশিয়ে দেওয়া হতো, যার ফলে তার মুখে ক্ষত তৈরি হয়। এভাবে ফাঁসির আগেই তিনি আধমরা হয়ে গিয়েছিলেন এবং তার ওজন মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাকে চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। একই সময়ে পিপলস পার্টির কর্মী-সংগঠকদের ওপরও নির্যাতন চলছিল।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তরুণ ভুট্টো সম্পর্কে হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ছিল। কিসিঞ্জার তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে ভুট্টো ছিলেন মার্জিত, বাক্​পটু ও সূক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী। তিনি ভুট্টোকে মেধাবী ও আনন্দদায়ক হিসেবে দেখেছিলেন, যার ধারণাগুলো ছিল বিশ্বমানের এবং সহজে বোকা বনে যাওয়ার লোক তিনি ছিলেন না।

কিসিঞ্জারই পরে ভুট্টোকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেন। ১৯৭৬ সালের আগস্টে তিনি পাকিস্তানে আসেন এবং অসন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যান। লাহোর গভর্নর হাউসে ১০ আগস্টের বৈঠকে কিসিঞ্জার ভুট্টোকে বলেছিলেন, এই কর্মসূচি ত্যাগ না করলে ভয়ংকর উদাহরণ অপেক্ষা করছে। কিসিঞ্জারের এই সফরের কয়েক মাস পরই ভুট্টো ক্ষমতাচ্যুত হন।

মাঝের সময়টিতে ভুট্টোবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে দেখা যায়। আহলে সুন্নত নামের প্রভাবশালী একটি ধর্মীয় সংগঠন তখন ফতোয়া জারি করে যে ভুট্টোবিরোধী আন্দোলনে যারা গুলিতে মরছে, তারা সবাই শহীদ। এ সময় বিভিন্ন বিষয়ে শরিয়াহ আইন চালুর দাবি উঠতে শুরু করে।

ইমরান খানের ক্ষেত্রেও অনেকটাই অনুরূপ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। দেশটির তরুণ-তরুণীরা একসময় তার নেতৃত্বে 'হাকিকি আজাদি' বা প্রকৃত স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখত। সামরিক আমলাতন্ত্র তখন শরিফ ও ভুট্টো বংশকে কোণঠাসা করতে ইমরানকে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছিল।

বর্তমানে ওই দুই বংশকে দিয়েই ইমরান খানের কারাভোগ ও নিপীড়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ইমরানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়েছে এবং মাঝেমধ্যে এসব মামলার কোনো কোনোটিতে সাজা হচ্ছে। রাওয়ালপিন্ডিতে পুরোনো যে জেলা কারাগারে ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছিল, সেখান থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ১৯৮৬ সালে নতুন একটি কারাগার তৈরি হয়।

সেই নতুন কারাগার, যা স্থানীয়ভাবে 'আদিয়ালা জেল' নামে পরিচিত, সেখানেই এখন ইমরান খান আছেন। গত আগস্টে তার বন্দিত্বের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। রাজনীতিবিদদের জন্য কারাজীবন নতুন কিছু নয়, তবে ইমরানের ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ তার স্বাস্থ্যের অবনতি। পাকিস্তানে অনেকের ধারণা, তিনি ইতিমধ্যে অন্তত একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে চলেছেন।

বিচার বিভাগের নির্দেশ সত্ত্বেও তাকে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইমরানের সুচিকিৎসার দাবিতে খ্যাতিমান ক্রিকেটাররা সম্প্রতি একটি নজিরবিহীন বিবৃতি দিয়েছেন, কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...