পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির সামরিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে উভয় নেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। একসময় সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রিয়পাত্র ছিলেন ভুট্টো, এখন ইমরান খানও একই ধরনের পরিণতির পথে রয়েছেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে।
জুলফিকার আলী ভুট্টো একসময় পাকিস্তানের সামরিক আমলাতন্ত্রের সমর্থন পেয়েছিলেন। তার সমস্যা শুরু হয় যখন তিনি পারমাণবিক বোমা কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান। এর ফলস্বরূপ, ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং কিছুদিন পরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা আগেও ভুট্টো জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ভুট্টো তার সামনে কী অপেক্ষা করছে তা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে আটক করা হয়। ১৯৭৮ সালের মার্চে ভুট্টোর ফাঁসির আদেশ হয় এবং পরের বছরের ২৪ মার্চ উচ্চ আদালতে সেই আদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপরের মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাওয়ালপিন্ডি কারাগারে সেই আদেশ কার্যকর করা হয়েছিল।
জেনারেল জিয়া-উল-হক ১৯৮৮ সালে রাওয়ালপিন্ডির ওই কারাগারটিও ভেঙে ফেলেন। সেখানে বর্তমানে 'জিন্নাহ পার্ক' তৈরি করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক আমলাতন্ত্র জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের পছন্দ করে না, কারণ এতে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একাধিপত্য বাধাগ্রস্ত হয়। সামরিক আমলাতন্ত্র, ভুট্টো ও শরিফ বংশ এবং ওয়াশিংটনের সমর্থন মিলে একটি শক্তিশালী ত্রিভুজ তৈরি হয়েছিল।
আদালতে ভুট্টোর ফাঁসির রায় হওয়ার পরও সাধারণ পাকিস্তানিরা ভেবেছিল এটি বদলাবে। ভুট্টো নিজেও এমন কিছু বিশ্বাস করতেন। তবে ফাঁসির আগেই তিনি প্রিয়ভাজন জেনারেলের নির্মমতা দেখেছিলেন। আটক ও ফাঁসির মাঝের সময়ে কারাগারে ভুট্টোকে তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছিল। তাকে মাসের পর মাস আলো-বাতাসহীন একটি কক্ষে রাখা হয়।
ভুট্টোর খাবারে কাচের গুঁড়া মিশিয়ে দেওয়া হতো, যার ফলে তার মুখে ক্ষত তৈরি হয়। এভাবে ফাঁসির আগেই তিনি আধমরা হয়ে গিয়েছিলেন এবং তার ওজন মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাকে চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। একই সময়ে পিপলস পার্টির কর্মী-সংগঠকদের ওপরও নির্যাতন চলছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তরুণ ভুট্টো সম্পর্কে হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ছিল। কিসিঞ্জার তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে ভুট্টো ছিলেন মার্জিত, বাক্পটু ও সূক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী। তিনি ভুট্টোকে মেধাবী ও আনন্দদায়ক হিসেবে দেখেছিলেন, যার ধারণাগুলো ছিল বিশ্বমানের এবং সহজে বোকা বনে যাওয়ার লোক তিনি ছিলেন না।



মতামত (0)