জাতীয়

নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি: মৌলিক প্রশ্ন ও উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি: মৌলিক প্রশ্ন ও উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি: মৌলিক প্রশ্ন ও উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ
গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে অন্তত দশজন সংসদ সদস্য নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তবে উচ্চশিক্ষার মান, কর্মসংস্থান ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে অন্তত দশজন সংসদ সদস্য নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের যুক্তিতে এই ধরনের দাবি আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হিসেবে বিবেচিত।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাওয়া হচ্ছে, কেন এর প্রয়োজন, সেখানে কত শিক্ষার্থী পড়বেন এবং কী ধরনের গবেষণা হবে, এসব বিষয় বিবেচনায় আনা উচিত। এছাড়া, কত অর্থ লাগবে এবং সেখান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা কী করবেন, সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

‘আমার নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চাই’—এই দাবি করা সহজ হলেও এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বড় সংকট হলো শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করার আগে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চাহিদা, স্থানীয় অর্থনীতির প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান বিবেচনা করা জরুরি। যোগ্য শিক্ষক পাওয়ার সুযোগ, গবেষণার সম্ভাবনা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাবও যাচাই করা উচিত। এসব সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সমীচীন নয়।

গত আওয়ামী লীগ সরকার জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়া। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

একই সঙ্গে ক্যাম্পাস, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের নামে বড় ধরনের প্রকল্প ও ঠিকাদারি ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে রাজনৈতিক স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ্রহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘আগে ঘোষণা, পরে পরিকল্পনা’ সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি।

জমি, মহাপরিকল্পনা, পরিবেশগত অনুমোদন, একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন, শিক্ষক এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ন্যূনতম প্রস্তুতি ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা উচিত নয়। গত দেড় থেকে দুই দশকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি সরকারি, ১১৭টি বেসরকারি ও ৩টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও রয়েছে।

এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি ও পেশাগত উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ৩৮ লাখ শিক্ষার্থী পড়ছেন, যা দেশের উচ্চশিক্ষার প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হচ্ছে? পরিসংখ্যান অন্তত সে আশঙ্কাই তৈরি করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকার ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক পাস বেকার ৮ লাখ ৮৫ হাজার। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যেখানে জাতীয় বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট বেকারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই স্নাতক ডিগ্রিধারী।

বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সব তরুণকে একই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কারও প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, কারও প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা, কারও কৃষি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা বা উদ্যোক্তা শিক্ষা। আবার কারও জন্য প্রয়োজন উচ্চতর কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা।

এর অন্যতম কারণ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় অংশ এখনো শিক্ষার্থীদের শুধু ডিগ্রি দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী। শ্রমবাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করা প্রায় সবাই মাস্টার্স করেন। গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা কিছু বিশেষায়িত পেশার জন্য মাস্টার্স প্রয়োজন। তবে অনেক ক্ষেত্রে মাস্টার্স এখন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা বা বিয়ের বাজারে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোয় সবাই মাস্টার্স করেন না। ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী অনেকে ব্যাচেলর ডিগ্রির পরই চাকরিতে প্রবেশ করেন। কেউ কেউ দক্ষতাভিত্তিক ডিপ্লোমা বা স্বল্পমেয়াদি উচ্চতর কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্যমতে, উন্নত ও উচ্চ আয়ের ৩৮টি দেশের ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী টারশিয়ারি শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ৪৮ শতাংশ ব্যাচেলর বা সমমানের ডিগ্রিধারী। ৩৫ শতাংশ মাস্টার্স বা সমমানের ডিগ্রি করেছেন এবং বাকি ১৭ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি টারশিয়ারি শিক্ষা নিয়েছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...