শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা: প্রতিমন্ত্রী

প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা: প্রতিমন্ত্রী
প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা: প্রতিমন্ত্রী
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পিটিআইয়ের সক্ষমতা ছয় গুণ বাড়ানো হবে এবং প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মেয়াদ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে ছয় গুণ বাড়িয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে পদোন্নতি কার্যক্রমের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পরেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।

প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি নিজ দপ্তরে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, ক্লাসরুমে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির রূপরেখাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে পারদর্শী করতে প্রশিক্ষণের নতুন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় দীর্ঘ সময় ক্লাসরুমে দায়িত্ব পালনের বর্তমান ধারাকে একটি নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে আনা হচ্ছে।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকেরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ক্লাসে ফিরে যাবেন। এরপর নির্ধারিত সিলেবাস বা মডিউল অনুযায়ী বাকি সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে তাঁদের প্রশিক্ষণ মডিউল ও পরীক্ষাগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে। এই সময়সীমা আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এক বছর নির্ধারণ করে একটি নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। সম্প্রতি নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ব্যাচগুলো এই মডিউল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পাবে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্লাসরুমে পাঠদানে চলে যাবেন। বাকি দশ মাস অনলাইন ও অফলাইন মিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে পিটিআইগুলোর বার্ষিক প্রশিক্ষণের সক্ষমতা প্রায় সাত হাজারের মতো। এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। এই প্রশিক্ষণে শুধু পিটিআই নয়, প্রয়োজনে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এডুকেশন ডিপার্টমেন্টকে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে আরও পারদর্শী করে তোলা হবে।

একই সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, “নীতিগতভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—কোনো শিক্ষক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না নিয়ে ক্লাসরুমে স্থায়ীভাবে পাঠদানে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না।” এটি শিক্ষকদের পেশাগত মান উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি ধরে রাখা ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি ‘মিড-ডে মিল’ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী কথা বলেন। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় মিড-ডে মিল চালু রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে এই কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

এ–সংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আগামী বছর থেকে সারাদেশে মিড-ডে মিল কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এটি কেবল একটি ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়ার প্রকল্প নয়। তিনি বলেন, গুগলসহ বৈশ্বিক বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ক্লাসরুমের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে। এই ইকোসিস্টেমের মূল কানেক্টর হিসেবে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছানো হবে।

এছাড়া, যেসব দুর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ নেই, সেগুলোতে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন ও ব্যান্ডউইথ নিশ্চিতের কাজ চলছে। এটি ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারে সহায়ক হবে।

সারা দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ আদালতের রায়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রমের আইনি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে এ বিষয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়ের চূড়ান্ত কপি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। এটি সম্পন্ন হলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন শিক্ষক নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হবে এবং বিপুল পরিমাণ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা কমিয়ে আনন্দদায়ক শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গল্প বলার মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত-বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা প্রদানের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের কষ্ট নিরসনেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...