প্রবাসী

প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রের ভূমিকা

প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
‘রঙিন সুরমা’ চলচ্চিত্রটি বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের সংগ্রামকে তুলে ধরেছে। এতে তাদের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে আসে, যা রাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘রঙিন সুরমা’ মানবিক সম্পর্কের গল্প তুলে ধরেছে। চলচ্চিত্রটিতে একজন মধ্যবয়স্ক বাংলাদেশি দম্পতির দুঃখ-সুখের সহজ ও হৃদয়গ্রাহী চিত্রায়ন দেখানো হয়েছে। রিয়াজুল হক ইমরান এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন। আফজাল হোসেন এবং আফসানা মিমি এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁদের আটপৌরে জীবনের খুঁটিনাটি ও অপ্রকাশ্য শোকের ভার বহনের অভিনয় দর্শকদের কাছে বাস্তব মনে হয়েছে।

‘রঙিন সুরমা’ চলচ্চিত্রটি প্রবাসী ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের সংগ্রাম এবং অসহায়ত্বের গল্পকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। দুই-তিন দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে খুব অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রী বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেতেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মেধাবী ও বৃত্তিপ্রাপ্ত অথবা ধনী পরিবারের সন্তান। সে সময়ে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগকে অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে গণ্য করা হতো। ধরে নেওয়া হতো, বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে প্রবাসে বা স্বদেশে উচ্চ বেতনে চাকরি পাওয়া যাবে।

এখন বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ আগের মতো দুর্লভ নয়। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ষাট হাজার বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী বর্তমানে বিদেশে পড়াশোনা করছেন। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসী ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যারা দেশে ফিরে আসেন, তারা সমসাময়িক জ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে আসেন, যা দেশের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। যারা প্রবাসেই থেকে যান, তারা বিদেশি মুদ্রা দেশে পাঠান, যা দেশের অর্থনীতির জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তবে প্রবাসী ছাত্রছাত্রী এবং তাদের পরিবারের প্রতি সামষ্টিকভাবে একটি অবচেতন ঈর্ষা লক্ষ্য করা যায়। সাহায্য করার বদলে তাদের পথে বাধা সৃষ্টি করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বিদেশে পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশ থেকে শিক্ষামূলক ঋণের সুযোগ খুব সীমিত। বাংলাদেশের জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের বরাদ্দও অতি অল্প। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েকেই পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে, দামী ডলার-পাউন্ড-ইউরো কিনে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করতে হয়।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপ-আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলাদেশে নিজেদের ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দেয়নি। এর হয়তো সঙ্গত কারণ থাকতে পারে। তবে উচ্চতর ও উন্নততর পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশি ছেলেমেয়েদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার বিকল্প উপায় সীমিত। দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ পাওয়া সহজ নয় এবং সেখানে উচ্চতর গবেষণার সুযোগও সীমিত।

মেধা, পরিশ্রম বা সম্পদের জোরে যেসব ছাত্রছাত্রী শেষ পর্যন্ত বিদেশে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান, তাদের সংগ্রাম শুরু হয় এরপর থেকেই। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপত্র ও নম্বরপত্র সংগ্রহ করা, বিদেশে ভর্তির ফি পাঠানো এবং ভিসাপ্রাপ্তির জন্য অকারণ ও দুরূহ সব শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ছাত্রছাত্রী এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে পারেন না।

হিমালয়সম বাধা পেরিয়ে যেসব ছাত্রছাত্রী বিদেশে যান, তাদের জন্য রাষ্ট্র কতটুকু করতে পারে তা একটি প্রশ্ন। যে দেশে তারা যাচ্ছেন, সে দেশের সংস্কৃতি, আচার, আইন-কানুনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাদের পক্ষে দুর্লভ। প্রায় অপ্রস্তুত অবস্থায় বিদেশে গিয়ে তাদের ‘কালচারাল-শক’ সহ্য করতে হয়।

দেশে পড়াশোনার মানের ঘাটতি সামলাতে গিয়ে বিদেশে তাদের বেশিরভাগকেই নিজের পাঠ্যসূচীর বাইরে বাড়তি পড়াশোনা করতে হয়। এর পাশাপাশি নিজেদের গৃহস্থালীর কাজ, খন্ডকালীন চাকরির জন্য সময় ও শ্রম দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ কমানো বা ঋণ শোধ করার তাগিদ থাকে। এর ফলে বহু ছাত্রছাত্রীকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়, দেশে ফিরে আসতে হয় বা অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হতে হয়। কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো চরম পথও বেছে নিয়েছেন।

‘রঙিন সুরমা’ চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি তার প্রবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরও কিছু করতে পারে? সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বিদেশের হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে হয় যে ছেলে বা মেয়েটিকে, তার জন্য রাষ্ট্রীয় বীমার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। টাকার অভাবে সাময়িকভাবে পড়াশোনা স্থগিত রাখতে হচ্ছে যে মেধাবী ছাত্রটিকে, তার জন্য ঋণ বা কাজের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...