প্রবাসী

প্রবাসী কার্ড: অভিবাসন ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন

প্রবাসী কার্ড: অভিবাসন ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন
প্রবাসী কার্ড: অভিবাসন ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন
সরকার আগামী অক্টোবর মাসে প্রবাসী কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু করছে, যা অভিবাসী কর্মীদের জন্য সমন্বিত সেবা ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসীরা তাঁদের অভিবাসন যাত্রায় এখনো বিচ্ছিন্ন ও জটিল সেবাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যান। কাজ খোঁজা থেকে শুরু করে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ছাড়পত্র, বিদেশে সুরক্ষা, দেশে পরিবারের সহায়তা এবং ফিরে এসে নতুন জীবন শুরু করা পর্যন্ত একজন প্রবাসী কর্মী সমন্বিত সেবা পান না। অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান দৃশ্যমান হলেও রাষ্ট্রীয় সেবার কাঠামো ততটা সমন্বিত নয়।

এই বাস্তবতায় সরকার প্রবাসী কার্ড উদ্যোগ নিয়েছে। এটি শুধু একটি কার্ড হিসেবে নয়, বরং পুরো প্রবাসী সেবাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার আগামী অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।

এই কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে ২ লাখ কার্ড বিতরণ করা। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট এবং ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করার কথা রয়েছে।

প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই পাঠান না, তাঁরা দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রা, ভোগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও সচল রাখেন। প্রবাসী কার্ডের সাফল্য কেবল কতটি কার্ড বিতরণ হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। এটি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে হুন্ডির চেয়ে সহজ ও আকর্ষণীয় করবে কি না, বিদেশে বিপদে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করবে কি না, দেশে পরিবারের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করবে কি না, এবং ফিরে আসা কর্মীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়কে দেশের অর্থনীতির সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারবে কি না, সেসব বিষয়ে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।

প্রবাসী কার্ডকে কেবল একটি ডেবিট কার্ড হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। এটিকে একজন অভিবাসী কর্মীর পুরো জীবনচক্রের ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রথম ধাপ হিসেবে একটি যাচাই করা বিদেশি চাকরির তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। কোন দেশে কোন পেশায় কী ধরনের কর্মীর চাহিদা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, বেতন, নিয়োগকর্তা, নিয়োগ ব্যয় ও চুক্তির মেয়াদ—এসব তথ্য কর্মীদের আগে থেকেই জানানো উচিত। বাংলাদেশ মিশন বা অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া কোনো চাকরির তথ্য এই প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা উচিত হবে না। এটি দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাবে এবং সরকারও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার বাস্তব চিত্র পাবে।

বাংলাদেশ এখনো বিপুলসংখ্যক অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠায়, অথচ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই কতজন বিদেশে গেলেন, সেটির চেয়ে তাঁরা কী দক্ষতা নিয়ে যাচ্ছেন এবং কত আয় করছেন, সেটিই সাফল্যের প্রকৃত সূচক হওয়া উচিত।

এই প্ল্যাটফর্মে একজন কর্মী তাঁর কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সনদ এবং কোথায় তা পাওয়া যাবে, তা দেখতে পারবেন। প্রশিক্ষণ শেষে সনদ ডিজিটাল প্রোফাইলে যুক্ত হলে অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও সহজে যাচাই করা দক্ষ কর্মী খুঁজে নিতে পারবে।

পরবর্তী ধাপে বিএমইটি নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সনদ, মেডিক্যাল রিপোর্ট, বিমা, চাকরির চুক্তি, বেতন, অভিবাসন ব্যয়, ছাড়পত্রসহ সব তথ্য কর্মীর নিজস্ব ডিজিটাল প্রোফাইলে সংরক্ষিত থাকবে। বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই কর্মীরা নিশ্চিত হতে পারবেন যে সরকারি নথিতে চাকরির শর্ত বাস্তব চুক্তির সঙ্গে মিলছে কি না।

বিদেশে অবস্থানকালে অভিযোগ, বিমা দাবি বা জরুরি সহায়তার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণ করা যাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ মিশন, বিএমইটি, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠানো যাবে।

সবশেষে দেশে ফেরা কর্মীদের অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, দেশ ছাড়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে দেশে ফিরে সেই দক্ষতার পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো অভিবাসন-জীবনচক্রকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবাব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪০-৪৫ শতাংশ রেমিট্যান্স হুন্ডির মাধ্যমে আসে। এই বিপুল অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ দেখায় যে শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বৈধ পথে টাকা পাঠানোকে আরও সহজ, দ্রুত ও লাভজনক করতে হবে।

প্রবাসী কার্ড এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার এর আওতায় রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ক্রেডিট স্কোরিং চালুর কথা জানিয়েছে। এসব সুবিধা এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের সুফল পান।

প্রবাসীদের অনেকেই দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও তথ্যের অভাব, জটিলতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটে পিছিয়ে যান। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র, অবসর ভাতা স্কিম, সরকারি বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, আবাসন, শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা গেলে প্রবাসী আয় ভোগের পাশাপাশি দেশের উৎপাদনশীল খাতেও আরও বেশি প্রবাহিত হতে পারে।

বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ও নিয়মিততার ভিত্তিতে প্রবাসীর অ্যাকাউন্টে রিওয়ার্ড পয়েন্ট জমা হতে পারে। এসব পয়েন্ট রেমিট্যান্স বা ব্যাংকিং ফি, বিমার প্রিমিয়াম, বিমানবন্দর ও প্রবাসী সেবা কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি সেবার ফি পরিশোধে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিয়মিত প্রেরকদের জন্য উচ্চতর রিওয়ার্ড স্তরও চালু করা সম্ভব।

ক্রেডিট স্কোরিংয়েরও বাস্তব আর্থিক মূল্য থাকতে হবে। অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর দেশে অর্থ পাঠালেও প্রচলিত বেতন হিসাব বা ঋণের ইতিহাস না থাকায় ব্যাংক তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। রেমিট্যান্সের পরিমাণ ও ধারাবাহিকতাকে আর্থিক প্রোফাইলে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...