রাজনীতির্যাবের নামে এসআরবি গঠন নয়: বিরোধীদলীয় নেতা
র্যাবের নামে এসআরবি গঠন নয়: বিরোধীদলীয় নেতা
জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতি র্যাব বিলুপ্তি চেয়েছিল, একই বাহিনীকে শুধু নতুন নামে ফিরিয়ে আনা নয়।
জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, র্যাব বিলুপ্তির নামে জনবল, স্থাপনা, লজিস্টিক, ক্ষমতা ও অবকাঠামো অপরিবর্তিত রেখে একই ধরনের নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনের বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জাতি র্যাব বিলুপ্তি চেয়েছিল, একই বাহিনীকে শুধু নতুন নামে ফিরিয়ে আনা নয়। জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয়তা ও কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা না করে এমন একটি আইন পাস করা উচিত নয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের আওতাধীন বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে এসআরবি গঠনের লক্ষ্যে বিলটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত আইনে র্যাবের জনবল, সম্পদ, নথিপত্রসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন ইউনিটে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই বিল জাতীয় জীবনের অন্য সাধারণ বিলের মতো নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। র্যাব প্রতিষ্ঠার পর এ বাহিনী সম্পর্কে জাতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি জানান, র্যাবের হাতে ভুক্তভোগী অনেকেই আজ সংসদে রয়েছেন। তিনি নিজেও এ বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ডা: শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, অনেকেই জীবন হারিয়েছেন, আবার অনেকে গুমের শিকার হয়ে আজও নিখোঁজ রয়েছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা গুমের শিকার হয়ে পরে ফিরে আসা সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের কথা উল্লেখ করেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগমের স্বামীর ওপর নির্যাতন ও তাকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা জাতির স্মৃতিতে রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এসব কারণেই র্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠেছিল। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে কথা বলেছে। কিন্তু র্যাব বিলুপ্ত করে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কেউ করেনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখন এমন একটি প্রস্তাব আনা হয়েছে, যেখানে প্রায় একই বাহিনীকে একই জায়গায় রেখে নতুন নামে পরিচালনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। র্যাবের সদস্যরাই থাকবেন, তাদের স্থাপনা থাকবে, লজিস্টিক থাকবে, ক্ষমতার কাঠামোও থাকবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?
তিনি বলেন, শুধু একটি নাম বদলে আরেকটি নাম বসালে জাতি সেটি গ্রহণ করবে না। মাত্র কয়েক দিন আগেও একটি ঘটনা ঘটেছে, যা প্রমাণ করে বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত সদস্যদের আচরণ ও মানসিকতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এসেছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীকে তার বাসা থেকে তুলে নিতে যাওয়ার ঘটনায় কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকজন দ্রুত সেখানে না পৌঁছালে ওই নারীকে নিয়ে যাওয়া হতে পারত বলে তিনি জানান। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ওই নারী কোনো অপরাধ করেছেন কি না, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে—যাদের নিয়ে অতীতে এত অভিযোগ উঠেছে, তাদের শুধু এক বাহিনী থেকে অন্য বাহিনীতে স্থানান্তর করলেই কি কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হবে?
তিনি বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছেন বলে জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও তিনি পর্যালোচনা করেছেন। র্যাব প্রতিষ্ঠার সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বাহিনীটির হাতে পরবর্তী সময়ে শুধু একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী নয়, গোটা জাতির বিভিন্ন অংশ নিগৃহীত হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এসআরবি গঠনের উদ্যোগ সামনে আসার পর দেশের নাগরিক সমাজ থেকেও আপত্তি উঠেছে এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই তাড়াহুড়া করে চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সাথে আলোচনা করে বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।
তার ভাষায়, কেন এমন একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন, তার যৌক্তিকতা জাতির সামনে আরও পরিষ্কার করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য সত্যিই এ ধরনের একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। জাতির মধ্যে আস্থা ও ঐকমত্য তৈরি না করে এমন একটি বিতর্কিত বাহিনীকে নতুন নামে প্রতিষ্ঠা করা হলে জনগণ স্বভাবতই তা গ্রহণ করবে না।
মতামত (0)