খেলাধুলা

রংপুর এখন দেশের টেবিল টেনিসের উর্বর ভূমি

রংপুর এখন দেশের টেবিল টেনিসের উর্বর ভূমি
রংপুর এখন দেশের টেবিল টেনিসের উর্বর ভূমি
ঢাকার পল্টনে চলছে উন্মুক্ত র‍্যাঙ্কিং টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোস্তফা বিল্লাহর মতে, টিটি-চর্চায় রংপুর এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলা। এই প্রতিযোগিতায় রংপুর টিটি সংস্থা থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ জন খেলোয়াড় অংশ নিচ্ছেন।

ঢাকার পল্টনে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়ামের তীব্র গরমের মধ্যেও টেবিল টেনিসের ব্যাট-বলের শব্দে মুখরিত পরিবেশ দেখা গেছে। দেশের টেবিল টেনিসে নিজেদের নাম লেখানোর অদম্য ইচ্ছা নিয়ে বিভিন্ন জেলার উদীয়মান খেলোয়াড়েরা এখানে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে রংপুর টেবিল টেনিস সংস্থার খেলোয়াড়েরা আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোস্তফা বিল্লাহর মতে, ফলের দিক থেকে হয়তো নয়, তবে টিটি-চর্চায় নড়াইলসহ অন্য সব জেলাকে টপকে দেশের ১ নম্বর উর্বর ভূমি এখন রংপুর। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া উন্মুক্ত প্রাইজমানি র‍্যাঙ্কিং টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে এর স্পষ্ট প্রমাণও মিলছে। এই প্রতিযোগিতায় বিকেএসপি থেকে সর্বোচ্চ ৪২ জন অংশগ্রহণকারী এসেছেন।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ জন খেলোয়াড় এসেছেন রংপুর টিটি সংস্থা থেকে। সারা দেশের ৩৯৩ জন খেলোয়াড় চার দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্টের জন্য নিবন্ধন করেছেন। ৭-৮ বছর বয়সী থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী প্রতিযোগীরাও ৫১০ টাকা এন্ট্রি ফি দিয়ে একক ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন।

রংপুর টেবিল টেনিস সংস্থা ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত আকমল তাজ। তার চাচাতো বোন, সাবেক জাতীয় টিটি খেলোয়াড় ও জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন কামরুন নাহার ডানা জানান, তাদের সময়ে রংপুরে তিনটি টেবিল ছিল, যখন ঢাকায় কয়েকটি ক্লাবে মাত্র একটি করে টেবিল থাকত।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্থাটি নিয়মিত আখতার মেমোরিয়াল টিটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করত। এসব টুর্নামেন্টে পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দল আসত। ডানা নিজেই এখান থেকে জাতীয় পর্যায়ে দ্বৈতে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।

এই ঐতিহ্য ধরে রেখে বর্তমান জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোহতাসিন আহমেদও এই সংস্থার খেলোয়াড়। পদাধিকারবলে স্থানীয় জেলা প্রশাসক এই সংস্থার সভাপতি। অতীতে সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলেও গত কয়েক বছর ধরে তা আর পাওয়া যাচ্ছে না।

বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকও সেভাবে নেই, যার ফলে গত দুই বছরের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে এবং সংস্থাটি অন্যান্য সংকটেও ভুগছে। এর মধ্যেই তাদের টিটি-চর্চা অব্যাহত রয়েছে। রংপুর শহরের নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ায় প্রায় ২৪ শতক জায়গায় সংস্থার একটি একতলা ভবন রয়েছে।

সেখানে চারটি টেবিলে সপ্তাহে সাত দিনই ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী অনুশীলন করেন। সংস্থার কোচ শামীম সাব্বির জানান, তারা বিনা ফিতে প্রশিক্ষণ দেন। পাঁচজনের মতো কোচ আছেন, যার মধ্যে লেবেল ওয়ান কোচ দুজন।

বাংলাদেশ টিটি ফেডারেশনের সহসভাপতি খন্দকার হাসান মুনীর তাদের সহযোগিতা করেন। রংপুর অনূর্ধ্ব-১৫ বালকে দেশের ১ নম্বর র‍্যাঙ্কিংধারী খেলোয়াড়সহ বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বেশ কয়েকজন ভালো খেলোয়াড় তৈরি করেছে।

একসময় ১৯৮৬ সালে যশোর ছিল দেশের টিটির 'রাজধানী'। নব্বইয়ের দশকে সেই মর্যাদা নড়াইলের দখলে চলে যায়। নড়াইল বছরজুড়ে নানা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মোস্তফা বিল্লাহ, মাহবুব বিল্লাহ, জাবেদ, গৌতম, সোমা, সালেহা, রুমির মতো অনেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন তৈরি করেছিল।

নড়াইল জেলার খেলোয়াড়েরা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ২২ বার এককে সেরা হয়েছেন। তবে মোস্তফা বিল্লাহর মতে, নড়াইলের সাফল্যের সেই ধারা এখন শুকিয়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে তিনি উদ্যোগের অভাব এবং ছেলেমেয়েদের টিটিতে আগ্রহ হারানোর কথা উল্লেখ করেন।

এবারের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নড়াইল থেকে মাত্র দুজন পুরুষ ও একজন নারী খেলোয়াড় এসেছেন। একা হোটেলে থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ায় নারী খেলোয়াড়কে ফেডারেশনের ক্যাম্পে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নড়াইলের খেলোয়াড় দাহির সুলতান বিপ্লব জানান, তাদের অনেকে বিকেএসপিতে চলে যাওয়ায় জেলায় খেলোয়াড়-সংকট দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে বিকেএসপির ৪২ জন টিটি খেলোয়াড়ের মধ্যে ৮ জনই নড়াইলের। বিপ্লব আরও জানান, নড়াইল জেলায় গোটা বিশেক খেলোয়াড় আছেন এবং তিনি একাই শহরে প্রশিক্ষণ দেন। একসময়ের আরেক টিটি-চর্চা কেন্দ্র উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর থেকে এই প্রতিযোগিতায় মাত্র একজন খেলোয়াড় এসেছেন। কুষ্টিয়া থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নাফিউল ইসলাম জানান, তিনি এসএসসিতে দুজন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে প্রতিযোগিতায় নিয়ে এসেছেন, যদিও তারা মূলত ঢাকায় এসেছে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে। গাইবান্ধা থেকে এসেছেন একজন খেলোয়াড়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...