শিক্ষাশিক্ষা, জলবায়ু ও বিনিয়োগে ফ্রান্স-বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের নবদিগন্ত: রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লের আহ্বান
শিক্ষা, জলবায়ু ও বিনিয়োগে ফ্রান্স-বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের নবদিগন্ত: রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লের আহ্বান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’
শিক্ষা, জলবায়ু ও বিনিয়োগে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ফেলিক্স গের্ডেস বলেন, গণতন্ত্র, গবেষণা, নাগরিক শিক্ষা ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। বাংলাদেশেও ন্যায্য অর্থনৈতিক নীতি, শ্রম ইস্যু এবং আন্ত
বাংলাদেশের সাথে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, সংস্কৃতি, জলবায়ু কার্যক্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ও ফ্রান্স ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে একসাথে কাজ করতে পারে। একইসাথে তিনি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেছেন।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে এই আহ্বান জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস) বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে প্রধান বক্তার বক্তব্যে। এই অনুষ্ঠানে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে তারা সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছেন। এফইএস বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গের্ডেস তার উদ্বোধনী বক্তব্যে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্র, গবেষণা, নাগরিক শিক্ষা ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বব্যাপী কাজ করছে এবং বাংলাদেশেও ন্যায্য অর্থনৈতিক নীতি, শ্রম ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আবদুল আলীম তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সঙ্ঘাত, অভিবাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অপতথ্যের বিস্তার এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি আরও যোগ করেন যে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সহযোগিতা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এই ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এটি বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে বাংলাদেশের মানুষের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত তার মূল বক্তব্যে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ফ্রান্সের নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, লিঙ্গ, পরিচয় বা সামাজিক পটভূমি নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর বিকল্প কোনো গ্রহ নেই’ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের কোনো বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, সঙ্ঘাত, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে। এসব সঙ্কট মোকাবেলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি ‘গ্লোবাল সাউথ’ কিংবা ‘কালেক্টিভ ওয়েস্ট’র মতো বিভাজনের পরিবর্তে অভিন্ন স্বার্থ ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক, শিক্ষা, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ও বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বিষয়েও আলোচনা হয়।
আলোচনাপর্বে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের জনগণের দৃঢ়তা ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতকে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশে ফরাসি বিনিয়োগ বাড়াতে উন্মুক্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ, দুর্নীতি দমন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
উচ্চশিক্ষা বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ দিচ্ছে এবং ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত কোর্সের সংখ্যাও বাড়ছে। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিতে ‘ক্যাম্পাস ফ্রান্স’ কাজ করছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা, তবে সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্লু ইকোনমি, মানবাধিকার, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা, জাতিসঙ্ঘের ভেটো ব্যবস্থা ও ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ব্লু ইকোনমিতে টেকসই বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। একইসাথে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণ এবং তৈরি পোশাক খাতে কারিগরি বাধা দূর করতে দুই দেশের আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
এই ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রবণতা। উদাহরণস্বরূপ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অনারারি কনসালদের বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার শক্তিশালী দূত হিসেবে কাজ করার এবং বাণিজ্য ও ব্যবসার নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেখানে প্রযুক্তি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও দক্ষ কর্মসংস্থানে অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারা কুক স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষা, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিমসটেক সদস্য দেশগুলোকেও আর্থিক অপরাধ দমনে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে, যা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরে। এই সব আলোচনা থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র, যেখানে কূটনীতি মূলত মানুষে-মানুষে সম্পর্কের বিষয় এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
মতামত (0)