বিনোদন২ কোটি রুপির ফেয়ারনেস ক্রিমের প্রস্তাব কেন ফিরিয়ে দিলেন সাই পল্লবী: আত্মসম্মান নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতা?
২ কোটি রুপির ফেয়ারনেস ক্রিমের প্রস্তাব কেন ফিরিয়ে দিলেন সাই পল্লবী: আত্মসম্মান নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতা?
ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনের জন্য ২ কোটি রুপির প্রস্তাব কেন ফিরিয়ে দেন সাই পল্লবী?
প্রিন্ট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
দক্ষিণী অভিনেত্রী সাই পল্লবী। ছবি: সংগৃহীত
যুগান্তর হোয়াটসঅ্যাপ
সাই পল্লবী—দক্ষিণী সিনেমার এমন এক নাম, যিনি গ্ল্যামারের বাঁধাধরা ছক ভেঙে বারবার নিজে
দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাই পল্লবী ২০১৯ সালে একটি ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনের জন্য ২ কোটি রুপির বিশাল অঙ্কের প্রস্তাব পেয়েও তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যা বিনোদন জগতে তার ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অর্থ বা খ্যাতির চেয়ে আত্মসম্মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি যে কতটা গুরুত্ব দেন, এই ঘটনাটি তারই জোরালো প্রমাণ।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে ‘বলিউড হাঙ্গামা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাই পল্লবী তার এই সিদ্ধান্তের পেছনের গভীর কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, সৌন্দর্য সচেতনতার নামে সমাজে প্রচলিত তথাকথিত গায়ের রঙের বৈষম্য তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং কীভাবে গায়ের রঙের কারণে স্বজন ও বন্ধুদের হীনমন্যতায় ভুগতে হয়, তা তিনি ভালো করেই জানেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বিশেষ করে তার ছোট বোনের একটি ঘটনা অভিনেত্রীর মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। সাই পল্লবীর বোন কিছুটা চাপা রঙের হওয়ায় তাদের মা প্রায়ই তাকে জোর করে ফল ও সবজি খাওয়াতেন, এই বিশ্বাসে যে সেগুলো খেলে গায়ের রঙ ফর্সা হবে। বোনের এই অনিচ্ছাকৃত কষ্ট এবং লড়াই সাই পল্লবীকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
অভিনেত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার বোনকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখে খুব আঘাত পেয়েছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, অন্তত আমার বোনের জন্য হলেও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত। তা না হলে এত টাকা দিয়ে আমি কী করব?’ এই উক্তিটি তার দৃঢ় নৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে।
ব্যক্তিজীবনে সাই পল্লবী অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করেন এবং কোনো ধরনের সৌন্দর্যের প্রসাধনী ব্যবহার করতে পছন্দ করেন না। মেকআপে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করায় তিনি পর্দায় বা জনসম্মুখে নিজের ব্রণ বা ত্বকের খুঁত লুকানোর চেষ্টাও করেন না, যা তাকে আরও বেশি বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। তার মতে, মানুষ যেমন, ঠিক তেমনভাবেই নিজেকে ভালোবাসা উচিত এবং নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে রূপালি পর্দায় আসার আগে দৃশ্যপট এমন ছিল না; ২০১৫ সালে ‘প্রেমাম’ সিনেমা দিয়ে আত্মপ্রকাশের আগে সাই পল্লবী নিজেও ব্রণ নিয়ে মারাত্মক হীনমন্যতায় ভুগেছেন। সেই সময় ব্রণ ঢাকতে তিনি শত শত ক্রিম ব্যবহার করতেন এবং বাড়ি থেকে বের হতেও দ্বিধাবোধ করতেন, তার মনে হতো সবাই বুঝি তার চোখের দিকে না তাকিয়ে মুখের ব্রণের দিকেই তাকিয়ে কথা বলছে। সেই সময়কার তার মানসিক অবস্থা ছিলো বেশ জটিল।
তবে ‘প্রেমাম’ মুক্তির পর বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট; মেকআপহীন ও ব্রণসহ চেহারাতেই দর্শক তাকে বিপুল ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্ম তাকে দেখে অনুধাবন করে যে, গায়ের রঙ বা ত্বকের সমস্যা কোনো বাধার কারণ হতে পারে না, বরং এটি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
দর্শকদের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং সমর্থনই সাই পল্লবীকে নতুন শক্তি দেয় এবং তার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। পল্লবী মনে করেন, যে ভক্তরা তাকে তার স্বাভাবিক রূপেই গ্রহণ করেছেন ও ভালোবেসেছেন, কোনো ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন করে তাদের বিশ্বাস ভাঙা উচিত নয়। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি এমন একটি বড় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি।
তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে সাধারণ মানুষ নিজের ত্বকের রঙ নিয়ে সংশয়ে ভুগবে এবং সমাজে বডি ইমেজ সংক্রান্ত সমস্যা আরও বাড়বে। তাই কোনোভাবেই তিনি নিজের ভক্তদের অনুভূতির সঙ্গে প্রতারণা করতে চাননি, যা তার সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ। এই চিন্তা থেকেই তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
চিকিৎসা পেশায় পড়াশোনা করা সাই পল্লবী, যিনি জর্জিয়ার এক মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী ছিলেন, শখের বশেই ২০০৮ সালে একটি ডান্স রিয়েলিটি শো-তে অংশ নেন। সেই বিনোদন জগতের মোহ তাকে টেনে আনে অভিনয় জগতে, যেখানে এসে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তার দুর্দান্ত নাচ ও সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে। চিকিৎসা থেকে অভিনয়ে আসার এই যাত্রা তার জীবনের এক অপ্রত্যাশিত বাঁক।
‘প্রেমাম’ সিনেমাটি তাকে রাতারাতি জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং মালায়ালাম এই ব্লকবাস্টার সিনেমাটির পর তিনি ২০১৬ সালে জনপ্রিয় অভিনেতা দুলকার সালমানের বিপরীতে ‘কালি’ সিনেমায় অভিনয় করেন। ২০১৭ সালে রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘ফিদা’র মাধ্যমে তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতে তার প্রবেশ ঘটে, যা টেলিভিশনে সর্বাধিক টিআরপি রেটিং পেয়েছিল এবং পঞ্চম বার দেখানোর সময়ও টিআরপি সর্বোচ্চ ছিল। পরে ‘দিয়া’ সিনেমার মাধ্যমে তামিল ইন্ডাস্ট্রিতেও তার অভিষেক হয়।
এই অভিনেত্রীর গালে কিছু ব্রণের দাগ লক্ষ্য করা গেলেও মজার ব্যাপার হলো, তার ভক্তরা এই ব্রণের দাগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং তারা মনে করেন এটি তার ব্যক্তিত্বের অংশ। সাই পল্লবীকে খুব একটা মেকআপ নিতেও দেখা যায় না, কারণ সামান্য মেকআপেই যেন তিনি অনন্য ও আকর্ষণীয়। তার এই স্বাভাবিকতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
সাই পল্লবী তার এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত এবং জীবনদর্শার মাধ্যমে বিনোদন জগতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, যেখানে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাস ও সততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার এই আদর্শ শুধু তার ভক্তদের মধ্যেই নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর অংশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং অনেককে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, একজন শিল্পী কেবল বিনোদনই দেন না, বরং সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বর্তমানে, এই অভিনেত্রীকে সামনে নিতেশ তিওয়ারির বহুলপ্রতীক্ষিত মহাকাব্যিক সিনেমা ‘রামায়ণ: পার্ট ১’-এ সীতার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে, যা এ বছরের ৮ নভেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। পর্দায় তার এই চরিত্র যেমন আলোড়ন তোলার অপেক্ষায়, তেমনি বাস্তবেও তার এই ব্যতিক্রমী আদর্শ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। তার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মতামত (0)