বিনোদনমনিকা বেলুচি: সৌন্দর্যের বাইরে এক অভিনেত্রীর সংগ্রাম
মনিকা বেলুচি: সৌন্দর্যের বাইরে এক অভিনেত্রীর সংগ্রাম
অভিনেত্রী মনিকা বেলুচি তার সৌন্দর্যকে পেছনে ফেলে একজন মানুষ ও শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেতে চেয়েছেন। তার জীবন জুড়ে সৌন্দর্য যেমন তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
ইতালির চিত্তা দি কাস্তেল্লো শহরে ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন মনিকা বেলুচি। আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পেরুজিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। পড়াশোনার খরচ জোগাতে মডেলিংয়ের কাজ শুরু করেছিলেন, যা পরে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মিলান ও প্যারিসে ক্যাটওয়াক, বিজ্ঞাপন ও ফ্যাশন অঙ্গনে তার মুখই একসময় একটি পরিচয়ে পরিণত হয়।
সিনেমায় পা রাখার আগে থেকেই মনিকা বেলুচি একটি ইমেজ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই ‘ইমেজ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তিই পরে তার কর্মজীবনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইতালির অভিনেত্রীরা তাকে ‘স্টুপিড মডেল’ বলে অভিহিত করতেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। সুন্দরী হওয়ার কারণে তাকে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও অভিনয়ক্ষমতা বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে।
মনিকা বেলুচি বলেছেন, সৌন্দর্য ঈর্ষা তৈরি করতে পারে। তার মতে, কোনো কাজ যদি শুধু সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে তা পাঁচ মিনিটের বেশি টেকে না। ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মালেনা’ ছবিতে তাকে এমন এক নারীর চরিত্রে দেখা যায়, যাকে সবাই দেখে কিন্তু কেউ সত্যিকার অর্থে বোঝে না। এই ছবিতে তার সংলাপের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
‘মালেনা’ চরিত্রে তার হয়ে কথা বলতো চোখ, হাঁটাচলা ও শরীর। পুরুষরা তাকে কামনা করতো, নারীরা হিংসা করতো, এবং একটি ছোট শহর তাকে ঘিরে নিজেদের মতো করে গল্প তৈরি করতো। বেলুচি প্রথমে এত কম সংলাপ দেখে অভিনয় কৌশল নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে, শরীরও কথা বলতে পারে।
বেলুচি তার নিজের ছোট শহরে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে মালেনা চরিত্রটি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন, এমন জায়গায় যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে সত্যের চেয়ে গল্প দ্রুত ছড়ায়। মালেনা তার সময়ের ভেতরে বন্দি ছিলেন, কিন্তু বেলুচি সারাজীবন সেই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। তার ব্যক্তিগত জীবনও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না।
ভিনসেন্ট ক্যাসেলের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ হয়, এবং তাদের দুই কন্যা রয়েছে। পরে তিনি পরিচালক টিম বার্টনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। ২০২৫ সালে বেলুচি ও বার্টন যৌথ বিবৃতিতে তাদের বিচ্ছেদের কথা জানিয়েছিলেন। বিচ্ছেদের কারণ তারা প্রকাশ্যে না জানালেও, বেলুচি পরে উল্লেখ করেন যে, তাদের পথ একসময় মিলেছিল, পরে আবার আলাদা হয়ে গেছে।
২০০৪ সালে প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ইতালীয় ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তিনি নগ্ন হয়ে ছবি তুলেছিলেন। এই ফটোশ্যুটটি কেবল একটি ‘প্রভোকেটিভ ফটোশ্যুট’ ছিল না। এটি তৎকালীন ইতালীয় ‘ফার্টিলিটি’ আইনের প্রতিবাদে করা হয়েছিল, যেখানে আইভিএফ ও ‘ডোনার স্পার্ম’ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল।
ভ্যাটিকান প্রকাশ্যে এই ফটোশ্যুটের বিরোধিতা করেছিল। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের শরীরকে কেবল সৌন্দর্যের বস্তু হিসেবে নয়, একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। এই বিষয়টি মনিকা বেলুচির গল্পকে সাধারণ ‘সুন্দরী অভিনেত্রীর জীবন’ থেকে আলাদা করে। মালেনার নারীটি ছিল অন্যের কল্পনায় তৈরি একটি ছবি।
মনিকা বেলুচিও একসময় তেমনই একটি ছবিতে পরিণত হয়েছিলেন — ইতালীয় সৌন্দর্যের, যৌনতার, পরিণত নারীত্বের এবং পুরুষের কল্পনার প্রতিচ্ছবি। সিনেমায় মালেনা নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাননি। তবে বেলুচি সেই সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই আজ তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো ‘বিশ্বের অন্যতম সুন্দরী নারী’ নয়।
তিনি একজন অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত, যিনি সারাজীবন প্রচলিত সুন্দরী হওয়ার বাইরেও একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন। এই পৃথিবী মনিকা বেলুচিকে বহুবার বহুভাবে দেখেছে। তাকে দেখা এবং তাকে সত্যিকার অর্থে চেনা — এই দুটি বিষয় কখনোই এক ছিল না।
মতামত (0)